স্বামী আয়ুব হোসেন ছিলেন ফুল চাষী। নিজের জমি না থাকায় অন্যের জমি বর্গা নিয়ে ফুল চাষ করতেন। যখন সংসারে সচ্ছলতা ফিরতে শুরু করে, তখনই কিডনি জটিলতায় আয়ুবের মৃত্যু হয়। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে অথই সাগরে পড়েন জেলেহার বেগম। পরে স্বামীর বর্গা নেওয়া জমিতে নিজেই ফুলের চাষ শুরু করেন। জমি তৈরি, চারা রোপণ থেকে বাজারজাত সবই তিনি করেন। এলাকার মানুষ তাঁকে ‘ফুলকন্যা’ বলে ডাকেন।
জেলেহার বেগম (৩৬) ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের বাশিপাড়ার বাসিন্দা। একমাত্র ছেলে তারেক আজিজ (১৮) মাধ্যমিকের ছাত্র। ফুল চাষকে আপন করে নিয়েছেন জেলেহার বেগম। পাশাপাশি বাড়িতে ছাগল-গরু, হাঁস-মুরগি পালন করেন।
জেলেহার বেগম বলেন, তার বাবার বাড়ি একই গ্রামে। প্রতিবেশী আয়ুবের সঙ্গে ২০০৩ সালে তার বিয়ে হয়। তার চাষযোগ্য জমি ছিল না। অন্যের জমিতে কাজ করে ৭ শতক জমি কিনে তিন কক্ষের একটি ঘর নির্মাণ করেছিলেন। এখন সেখানে তাদের বসবাস। আয়ুব মৃত্যুর আগে দেড় বিঘা জমি বর্গা নিয়েছিলেন, যে জমিতে তিনি ফুলের চাষ করতেন। ফুল চাষ করে তাদের অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফিরতে শুরু করে। কিন্তু জমানো টাকা না থাকায় স্বামীর চিকিৎসা করতে গিয়ে চার লাখ টাকা দেনা পড়ে যায়। তবুও স্বামী কে বাঁচাতে পারিনি। গত বছরের ২৩ জুলাই মারা যান।
জেলেহার বেগম আরও বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর দিশাহারা হয়ে পড়েন তিনি। ভেবে পাচ্ছিলেন না কীভাবে সংসার চালাবেন। তিনিও স্বামীর সেই ফুল চাষের হাল ধরেন। জমি তৈরি, সেচ দেওয়া, চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ফুল ওঠানো সবই করেন তিনি। এখন নিয়মিত ফুল উঠছে। বিঘায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। আশা করছেন, মৌসুম শেষে ফুল বিক্রি করতে পারবেন ১ লাখ টাকা। বর্তমানে বাজারে ফুলের দাম ভালো পাওয়া যাওয়ায় লাভ বেশি হচ্ছে। ইতিমধ্যে ফুল চাষ থেকে ঋণের ৭০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন তিনি।
সরজমিনে দেখা গেছে, ভোরের আলো ফুটতেই ফুলের হাট বসেছে। নানা জাতের ফুল বিক্রি করতে এসেছেন চাষীরা। ফুল হাতে বাজারে বিক্রির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন জেলেহার বেগম। তাকে এলাকার মানুষ ভালোবাসেন। চাষাবাদ সম্পর্কে বিভিন্ন পরামর্শ দেন। তিনি নিজেও স্বামীর চাষাবাদ দেখে অনেকটা শিখেছেন। খেতে ওষুধ ছিটানোর (স্প্রে) কাজটি ছেলে করে দেন। বাকি কাজ তিনি নিজেই করেন। জেলেহার বেগম বলেন, ‘ক্রেতারা আমাকে কখনো ঠকায় না। প্রতিবেশীরাও আমাকে সহযোগিতা করেন। এলাকার সবাই এখন আমাকে চেনে। আমিও চাষটাকে আপন করে নিয়েছি। এর মধ্যে স্বামীর স্মৃতি ও ভালোবাসা খুঁজে পাই।