৭ বছরের ছোট্ট শিশুটি জানতো না তার বাড়ির ঠিকানা। ঢাকায় বাবার কাছে যাওয়ার সময় হারিয়ে গিয়ে এক শিক্ষকের বাড়িতে আশ্রয় মিললেও আপনজনদের খুঁজে ফিরেছেন সারাক্ষণ। বাড়ির ঠিকানা বলতে না পারায় ফেরা হয়নি মায়ের কোলে।
পরিচয়হীনতার গ্লানি নিয়ে জীবন থেকে কেটে গেছে ২১টি বছর। এর মধ্যে স্বামী-সন্তান সংসার নিয়ে ব্যস্ত হলেও রক্তের টানে খুঁজে ফিরেছেন বাবা-মা আর আপনজনদের। শেষ পর্যন্ত পরিবারকে খুঁজে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা গোটা পরিবার। সে মেহেরপুরের গাংনীর মহিষাখোলা গ্রামের আব্দুর রহমানের মেয়ে।
রিনা জানান, হারিয়ে যাওয়ার পর সে একটি বাসে উঠে পড়ে। বাসের হেলপার তাকে জিজ্ঞেস করে কোন উত্তর না পাওয়ায় গাউসিয়া মার্কেটের সামনে নামিয়ে দেন। রিনা এদিক ওদিক ঘুরে তার দাদিকে খুঁজছিল। কিন্তু দাদিকে না পেয়ে একজন মহিলার সহযোগিতায় ঠাঁই হয় নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার দুপ্তারা ইউনিয়নের দরি সত্যবান্দী (বড় বীনারচর) গ্রামের বাসিন্দা মোতালেব মাস্টারের বাড়িতে।
তিন ছেলের জনক হলেও কোনো কন্যাসন্তান না থাকায় তিনি রিনাকে নিজের মেয়ের মতোই লালন-পালন করেন। স্কুলে ভর্তি করান, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনাও করান। পরে পড়াশোনা বন্ধ হলেও স্নেহ-ভালোবাসায় কোনো কমতি রাখেননি।সেখানেই কেটে যায় এক যুগ। পরে ২০১৪ সালের দিকে মাহবুব নামের এক যুবকের সঙ্গে রিনার বিয়ে হয়। বর্তমানে রিনা তিন সন্তানের জননী। তবে জন্মদাতা বাবা-মাকে খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কখনোই শেষ হয়নি।
রিনার বাবা আব্দুর রহমান জানান, তিনি ঢাকায় থাকতেন। মেয়ে রিনা থাকতো গ্রামে দাদির কাছে। মেয়ে বায়না ধরায় তার দাদি তাকে সাথে নিয়ে ঢাকায় আসে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, রিনা হারিয়ে যায় গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে। বহু খোঁজাখুজি করে তাকে আর পাওয়া যায় নি। একদিকে মেয়ে হারানোর শোক অন্যদিকে স্থানীয়দের মেয়ে বিক্রি করে দেয়ার অপবাদ তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। অবশেষে চার মাস আগে তিনি জনপ্রিয় উপস্থাপক আরজে কিবরিয়ার ‘আপন ঠিকানায়’ অনুষ্ঠানের মেয়ের তথ্য পাঠান। অপরদিকে পিতা মাতার সন্ধান চেয়ে রিনার স্বামিও তথ্য পাঠান। দুটি তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে গত ১৩ জুলাই নিশ্চিত হয়- এটাই সেই হারিয়ে যাওয়া রিনা আক্তার।
এরপর গত বুধবার (১৫ জুলাই) সন্ধ্যায় দীর্ঘ ২১ বছর পর রিনা ফিরে আসেন তার পিতার বর্তমান ঠিকানা গাংনীর সন্ধানী পাড়ায়। তাকে একনজর দেখতে ভিড় করেন পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এবং দূর-দূরান্তের মানুষ। আবেগঘন সেই পুনর্মিলনের মুহূর্তে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন স্বজনরা। সাত বছরের হারিয়ে যাওয়া সেই রিনা আজ তিন সন্তানের জননী। দীর্ঘ ২১ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে জন্মদাতা বাবা-মায়ের বুকে ফিরে পেলেন তিনি, আর বাবা-মাও ফিরে পেলেন তাদের হারিয়ে যাওয়া আদরের সন্তান।