সম্প্রতি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) কমানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) বহুজাতিক তামাক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) যে প্রস্তাব দিয়েছে সেটাতে রাজি হলে ২২০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারাবে সরকার।
একইসঙ্গে এ প্রস্তাব আমলে নিলে তা তামাক করনীতির ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব বিপজ্জনক নজির হয়ে থাকবে। যা তামাক কোম্পানিকে লাভবান করবে, কিন্তু জনস্বাস্থ্য ও রাজস্ব আয় উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হবে। আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকালে বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিএটিবি তাদের ডারবি, পাইলট ও হলিউড ব্র্যান্ডের প্রতি প্যাকেট সিগারেটের দাম ৭২ টাকা থেকে কমিয়ে ৬৩ টাকা এবং লাকি স্ট্রাইক ব্র্যান্ডের দাম ১০৮ টাকা থেকে ৯২ টাকায় নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে। এই লক্ষ্যে তারা মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক বিধিমালা, ২০১৬-এর বিধি ১১৮(ক) এবং সাধারণ আদেশ নং ০২/ভ্যাট/২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন বা ব্যাখ্যা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে অনুমোদিত সীমার মধ্যে প্রস্তুতকারকরা মূল্য নির্ধারণের ‘স্বাধীনতা’ পায়। তামাক কোম্পানিকে এই ধরণের স্বাধীনতা প্রদান করা হলে তা একটি আত্বঘাতি সিদ্ধান্ত হবে যা রাজস্ব আয় এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিএটিবির প্রস্তাবে রাজি হলে নিম্ন স্তরের প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে সরকার রাজস্ব হারাবে প্রায় ৭ টাকা ৪৭ পয়সা এবং মধ্যম স্তরের প্রতি প্যাকেটে রাজস্ব হারাবে ১৩ টাকা ২৮ পয়সা। সাম্প্রতিক বছর গুলোতে ব্রান্ড-ভিত্তিক বিক্রির তথ্য অনুসারে বিএটিবি’র ডারবি, পাইলট ও হলিউড সিগারেরেট সম্ভাব্য বিক্রির পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি শলাকা এবং লাকি স্ট্রাইক ১৮০ কোটি শলাকা। নিম্নস্তরে ১০ শলাকার দাম ৯ টাকা কমিয়ে ৭২ থেকে ৬৩ টাকা এবং লাকি স্ট্রাইকের দাম ১৬ টাকা কমিয়ে ১০৮ টাকা থেকে ৯২ টাকা করার সুযোগ দিলে সরকার ২ হাজার ২১১ কোটি টাকার বেশি (নিম্ন স্তরে ১৯৭২ কোটি ও মধ্যম স্তরে ২৩৯ কোটি টাকা) রাজস্ব হারাবে।
বিএটিবির আবেদনের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত ৭ জুন ২০২৬ জারি করা এসআরও নং ১২৯-আইন/২০২৬/৩৩৪-এর ৩ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, বাজারে ইতোমধ্যে প্রচলিত কোনো সিগারেট ব্র্যান্ডের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কমানো যাবে না। প্রতিষ্ঠিত এই নীতিগত সুরক্ষা একটিমাত্র বহুজাতিক কোম্পানির ব্যবসায়িক পূর্বাভাস ও মুনাফার স্বার্থে শিথিল করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কোনো একক প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় কৌশলের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় করনীতি পরিবর্তিত হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য শিল্প-প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের বিশেষ সুবিধা দাবি করার সুযোগ পাবে, যা সামগ্রিক কর কাঠামোর স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে এনবিআর নিম্ন স্তরের সিগারেটের এমআরপি ৬০ টাকা থেকে ২ টাকা বাড়িয়ে ৬২ টাকা নির্ধারণ করলেও বিএটিবি গত দুই বছর ধরে এই স্তরের সিগারেটের মূল্য ৭২ টাকা নির্ধারণ করে বাজারজাত করে আসছে। অনুমান নির্ভর রাজস্ব বৃদ্ধির তথ্য দিয়ে তারা দাম কমানোর যে আব্দার করেছে তা অযৌক্তিক এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের নীতি ও অবস্থানের সথে সাংঘর্ষিক। এটি সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষার প্রস্তাব। একদিকে তারা সিগারেরটর মূল্য নির্ধারণে বাজেট প্রস্তাবে সরকারের ব্যবহৃত ‘ও তদুর্ধ্ব’ শব্দের সুযোগ নিয়ে সিগারেটের উচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করে আসছে; অন্যদিকে তারা দাম কমিয়ে বাজার দখলের কৌশল হিসেবে সরকারের নীতির পরিবর্তন চাইছে। কেবল মাত্র নিজেদের বানিজ্যেক স্বার্থেই তারা এই স্ববিরোধী অবস্থান নিয়েছে।
বিএটিবি চিঠিতে অনুমান করেছে, দাম কমালে বিক্রি বেড়ে রাজস্ব বাড়বে। কিন্তু এই দাবির সপক্ষে কোনো নিশ্চয়তা নেই যে বাড়তি বিক্রির পুরোটাই অবৈধ বাজার থেকে বৈধ বাজারে স্থানান্তরিত হবে। বাস্তবে অধিক সম্ভাবনা হলো বৈধ বাজারের মধ্যেই ভোক্তারা তুলনামূলক কম দামি ব্র্যান্ডের দিকে সরে যাবে, যার ফলে মোট বিক্রি বাড়লেও সরকারের প্রকৃত রাজস্ব আরও কমে যাবে। একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য প্রণোদিত বাজার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট আইনি সুরক্ষা শিথিল করা রাষ্ট্রীয় রাজস্ব নীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং একইসঙ্গে আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিএনটিটিপি চলতি অর্থবছরে নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করে সর্বনিম্ন মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ এবং প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর প্রস্তাব দিয়েছিল। যা মূল্যস্তর সরলীকরণের পাশাপাশি রাজস্ব ও জনস্বাস্থ্য উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলত। কিন্তু এনবিআর সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করে নিম্ন স্তরের সিগারেটের দাম মাত্র ২ টাকা বাড়িয়ে ৬২ টাকা নির্ধারণ করে, যা মাত্র ৩.৩ শতাংশ বৃদ্ধি। অথচ দেশে বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৮.৬৬ শতাংশ। ফলে প্রকৃত অর্থে সিগারেটের ক্রয়ক্ষমতা কমেনি, বরং তা মূল্যস্ফীতির তুলনায় সস্তা হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দাম আরও কমানোর প্রস্তাব সম্পূর্ণভাবে জনস্বাস্থ্য ও রাজস্ব নীতির লক্ষ্যের পরিপন্থী।