মেহেরপুর শহর ও গ্রামে সর্বত্রই চলছে রমরমা অনলাইন ও ক্রিকেট বেটিং জুয়া। আগে কেবল শহর এলাকায় ক্রিকেট বা অনলাইন জুয়া দেখা গেলেও এখন তা মহামারির মতো প্রত্যান্ত গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে স্কুল, কলেজ পড়–য়া যুবকসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। এমনকি যারা নিরক্ষর তারাও বাজি ধরছেন অনলাইন বা ক্রিকেটের আইপিএল, বিপিএল, টি-টয়েন্টি কিংবা যেকোনো ক্রিকেট খেলায়।
তবে অনলাইন জুয়া নিয়েছে নতুন মোড়। জুয়া চলছে বিভিন্ন বেটিং সাইটে। প্রতিদিন হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত বাজি ধরছেন এই জুয়াড়ীরা। এই জুয়ার বাজি হয় মোবাইলে। তাই এই চক্রের সঙ্গে জড়িত সবাই এক প্রকার ধরা ছোঁয়ার বাহিরে থাকছে। তবে বর্তমানে মেহেরপুর পুলিশ প্রশাসন জুয়ার বিরুদ্ধে নড়েচড়ে বসার কারণে অনলাইন জুয়ার অনেক এজেন্টকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে।
জুয়ার বিষয়টি সকলের নজরে আসা ও ইতোমধ্যে অনলাইন জুয়ার অনেক এজেন্ট পুলিশের জালে ধরা পড়ায় জুয়ার সাথে সম্পৃক্ত এজেন্ট বা মিডিয়ারা বিভিন্ন মাধ্যম অবলম্বন করে বর্তমানে চালাচ্ছে জুয়ার আসর। তবে অনলাইন জুয়ার কারণে বর্তমানে ক্রিকেট মিডিয়াদের কর্মকান্ডে কিছুটা ভাটা পড়েছে। কারণ এখন একটি অনলাইন জুয়ার একাউন্ট থাকলেই সব ধরনের খেলাতেই বেটিং করা যায়। এছাড়া এসব সাইটগুলোতে বিভিন্ন ধরনের লাইভ জুয়াও চলে। সেক্ষেত্রে শুধু মাত্র মাষ্টার এজেন্টদের কাছ থেকে একটি একাউন্ট করে নিয়ে একাউন্টে ডলার, টাকা বা ইউরো লোড করে নিলেই সাইট গুলোতে যে কোন খেলায় অংশগ্রহণ করতে পারে।
তবে এ জুয়া খেলে কেউ হন কোটিপতি আবার কেউ হারিয়েছেন সর্বস্ব। তেমনই একজন কোটিপতি মেহেরপুর শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার চা দোকানীর ছেলে প্রকাশ অধিকারী। দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন জুয়ার অন্যতম এজেন্ট হিসেবে কাজ করলেও রয়েছেন ধরা ছোঁয়ার বাহিরে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেহেরপুরে ক্রিকেট জুয়ার অন্যতম এজেন্ট শহরের পুরাতন বাসষ্ট্যান্ড এলাকার প্রকাশ অধিকারী। প্রকাশ অধিকারী একই এলাকার প্রবীর অধিকারীর ছেলে। পিতা প্রবীর অধিকারী পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থেকে দোকান সরিয়ে এখনও নতুন বাস টার্মিনালে একটি চায়ের দোকান চালায়। অন্যান্য ব্যবসা বা চাকরি না থাকলেও একটি ফ্লেক্সিলোডের দোকান থাকলেও জুয়ার টাকায় রাজকীয় চলাফেরা তার।
প্রথমে ইন্ডিয়ান ভিসার টোকেনের কাজ করলেও পরে জড়িয়ে পড়েন ক্রিকেট জুয়ার মিডিয়া হিসেবে। এরপর আস্তে আস্তে হয়ে ওঠেন ক্রিকেট জুয়ার অন্যতম মিডিয়া। শুরু হয় জুয়ার জগতে তার পথচলা। ক্রিকেট মিডিয়ার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার বেটিং সাইটের মাস্টার এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। জুয়া খেলার অবৈধ ডলার, ইউরো ও দেশীয় অর্থ লেনদেনের হোতাও তিনি। অনলাইনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অবৈধভাবে ডলার কিনে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করেন।
সারা বছরই জুয়ার বিভিন্ন বেটিং ওয়েব সাইটে তার অর্থনৈতিক লেনদেন চলে। আর এই ক্রিকেট জুয়া ও বেটিং ওয়েবসাইটের লেনদেনের কমিশন থেকেই হয়ে উঠেছেন কোটি টাকার মালিক। এই কাজে তার ছোট ভাই বিকাশ ও এলাকার মুবিন নামের এক যুবকসহ কয়েক জন যুবক তাকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, এই জুয়া থেকেই তিনি শহরের পুরাতন বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় ফারুকের জমি কিনেছেন। সম্প্রতি একই এলাকার কালু অধিকারী নামের এক ব্যক্তির বাড়িসহ জমি ক্রয় করেছেন। ইতোমধ্যে সেই বাড়ি দোতলার কাজও সম্পন্ন করেছেন তিনি।
এছাড়াও সদর উপজেলার ঝাউবাড়িয়া খানপুর এলাকায় ছাদের আলী নামের এক ব্যক্তির সাড়ে তিন বিঘা একটি পুকুর ও টেঙ্গার মাঠ নামক এলাকায় সোহেল নামের এক ব্যক্তির আম ও লিচু বাগান লীজ নিয়েছেন। যেখানে তিনি বেশ কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। গত এক মাস আগে ওই বাগানেই দুই ভাইয়ের নামে ছয় কাঠা জমিও ক্রয় করেছেন বলে একটি বিশেষ সূত্রে জানা গেছে। সম্প্রতি তিনি একটি ১৬০ সিসি পালসার মোটরসাইকেলও কিনেছেন।
অন্যান্য ব্যবসা বা চাকরি না থাকলেও একটি ফ্লেক্সিলোডের দোকান থেকে এত টাকার মালিক বনে যাওয়া, জমি ক্রয় ও রাজকীয় চলাফেরা, পুকুর ও বাগান লীজ নিয়ে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করায় জনমনে ও এলাকাবাসীর মাঝে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। আসলে এত টাকার উৎস কোথায়। এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে ক্রিকেট ও অনলাইন জুয়ার অবৈধ লেনদেনের টাকায় তিনি এসব সম্পদ গড়েছেন। এলাকার অধিকাংশ যুবক তার এই জুয়ার চক্রে পড়ে নিঃস্ব হওয়ার উপক্রম। এই জুয়ার নেশায় অনেকেই তাদের সর্বস্ব হারিয়েছে। কিন্ত প্রকাশ হয়েছেন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। প্রশাসনের নজর এড়াতে নাম মাত্র একটি ফ্লেক্সিলোডের দোকান দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে ক্রিকেট জুয়া ও অনলাইন জুয়ার রমরমা ব্যবসা। এই দোকান থেকে হয় জুয়ার টাকার লেনদেন। প্রতিদিনই জুয়াড়ীদের আনাগোনা দেখা যায় দোকানে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, তিনি অনলাইন জুয়ার মেলবেট নামের একটি বেটিং সাইটের মাস্টার এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। এছাড়া এলাকার মুবিন নামের এক যুবককে দিয়ে বেট উইনার নামের একটি সাইট দিয়ে জুয়ার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা মল্লিকপাড়ার কুমার ও বাশবাড়িয়া-১ মামুন, চাঁদবিল ও মল্লিকপাড়া মেহেরপুর নামের এজেন্ট থেকে জুয়াড়ীদের কাছে ডলার, টাকা ও ইউরো লেনদেন করেন।
তারা এলাকার ও এলাকার বাইরের বিভিন্ন পেশার মানুষকে অনলাইন বেটিং সাইটের একাউন্ট খুলে দিয়ে দিনদিন তার আয়ের পরিধি বাড়িয়ে যাচ্ছেন। যত একাউন্ট খুলছে ততই বাড়ছে তার কমিশন। কারণ একাউন্ট খুলতে টাকা না নিলেও এই একাউন্টে খেলতে যে টাকা বা ডলার অথবা ইউরোর দরকার সেটির মাস্টার এজেন্ট এই প্রকাশ, বিকাশ আর মুবিন। ডলার, টাকা বা ইউরো লোড দেওয়া তাদের কাজ। আর এই কমিশন থেকেই তিনি হয়েছেন প্রায় কোটি টাকার মালিক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জুয়াড়ি বলেন, আমার মেলবেট নামের একটি একাউন্ট আছে। এখানে বাংলা টাকায় খেলা যায়। বাংলা টাকা সর্বনিম্ন ২শ থেকে শুরু যত খুশি একাউন্টে লোড করা যায়। প্রকাশ এই এলাকার এজেন্ট। প্রকাশের কাছে গেলেই টাকা লোড দিতে ও তুলতে পারি।
কিভাবে একাউন্ট করতে ও একাউন্টে টাকা লোড করে জানতে চাইলে বলেন, যারা মাস্টার এজেন্ট তাদের কাছে শুধুমাত্র এনআইডি কার্ড দিলেই একাউন্ট খুলে দেবে। এজেন্টের ঘর আছে। সেখানে গেলেই টাকা লোড করে দেবে। একাউন্টে টাকা লোড করতে আবার খেলায় জিতলে সেই টাকা তুলতে এজেন্টের কাছে যেতে হয়। টাকা তুলতে ও লোড করতে এজেন্টকে কমিশন দিতে হয়। প্রতি হাজারে দুই শত টাকা কমিশন পায় এজেন্ট। এলাকার প্রকাশ প্রতি দিন হাজার থেকে লাখ টাকা লেনদেন করে। সে সিজনে প্রতিদিন প্রায় দশ থেকে বিশ লক্ষ টাকা লেনদেন করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ভুক্তভূগী বলেন, অনেকের খেলা দেখে কৌতুহলের বসে পড়ে অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পা বাড়ায়। এই ফাঁদে পড়ে আমার জমিসহ প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। খেলার জন্য প্রকাশকে বলি। প্রকাশ আমাকে ভোটার আইডি দিয়ে একটি একাউন্ট খুলে দেয়। প্রকাশের কাছ থেকেই টাকা লোড করতাম আবার ওর কাছ থেকেই টাকা তুলতাম। একদিনে আমি তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত লেনদেন করেছি প্রকাশের সাথে। খেলাতে এক সময় আমি আসক্ত হয়ে পড়ি। টাকা তো শেষ হয়েছেই এমনকি জমির দলিল বন্ধক রেখেও টাকা নিয়ে খেলেছি। পরে বুঝলাম এই খেলায় আসলে কেউ জিততে পারে না। আজ পর্যন্ত এই খেলায় কেউ লাভবান হতে পারেনি। শুধু আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয় এজেন্টরা। টাকা তুললে এবং টাকা লোড করলেও কমিশন পাই এজেন্টরা। প্রতি লাখে ১৩ হাজার টাকা কমিশন পাই প্রকাশ। প্রকাশের প্রতিদিন ১০- ২০ লক্ষ টাকা এই জুয়ার সাইটে লেনদেন হয়। বর্তমানে প্রকাশ পুকুর ও বাগান লীজ নিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ এবং শহরে বাড়ি ও জমি ক্রয় করা সহ কোটি টাকার সম্পদ করেছে।
এবিষয়ে প্রকাশ বলেন, আমি কোন জুয়ার সাথে জড়িত নই। এসবের কোন প্রমান নেই। আমার ফ্লেক্সিলোড ও বিকাশের দোকানের ব্যবসা থেকেই এসব করেছি।