মেহেরপুরে চলতি মৌসুমে তীব্রতাপদাহে বেড়ে ওঠা, সার কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট ও অনাবৃষ্টিতে পাট চাষে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। মৌসুমের প্রথম দিকে পাটের দাম কিছুটা বাড়তি থাকলেও বতর্মানে কমেছে স্থানীয় বাজারে। তাই উৎপাদন খরচ উঠাতে কৃষকদের চোখ এখন পাটকাঠির দিকে। পাটকাঠির নানাবিদ ব্যাবহারের ফলে যথেষ্ট চাহিদাও বেড়েছে পাটকাঠির। বাণিজ্যিক ভাবে ব্যবহার বৃদ্ধিতে এর প্রতি যত্নবান হয়েছেন কৃষকরা।
পাট চাষিরা বলছেন, অনাবৃষ্টি, শ্রমিক সংকটে মজুরী বৃদ্ধি, পাট পচানোর জন্য সেচ দিয়ে পুকুর ভাড়াসহ নানা কারণে বেড়েছে পাটের উৎপাদন খরচ। অথচ বাজারে পাটের দাম একেবারই কম। অধিকাংশ পাট চাষিরা গর্তখুড়ে মাত্রারিক্ত লোডশেডিংয়ের ফলে অনেকসময় শ্যালোইঞ্জিনের মাধ্যমে পানি দিয়ে পাট জাগ দিচ্ছেন। যার ফলে পাটের আশের রং নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কমে যাচ্ছে বাজারমূল্য। তবে পরিবর্তন হচ্ছে না শুধু পাটকাঠির তাই পাটের আঁশের লোকসান পুষিয়ে নিতে পাটকাঠিতেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন চাষিরা।
মেহেরপুর সদর উপজেলার ঝাউবাড়িয়া গ্রামের পাট চাষি আসাদুজ্জামান জানান, বিভিন্ন মাঠের জমি বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে তাই এলাকা ভিত্তিক প্রতি বিঘা জমিতে পাট হয় ৮ থেকে ১০ মণ। আবার কোথাও কোথাও ১২ থেকে ১৪ মণ। বতর্মানে বাজারে নতুন পাটের দাম চলছে ১৫শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা করে মণ। আর এক বিঘা জমিতে পাটকাঠি হয় ১৩০ আটি। চাহিদা অনুযায়ি প্রতি আটি পাটকাঠি বিক্রি হয় ৪০-৪৫ টাকা। তাতে বিঘা প্রতি পাটকাঠিতে আসে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। গেল বছর একইভাবে পাটকাঠি বিক্রি করে মোটা টাকা আয় করেছেন তিনি।
গাংনী উপজেলার কুঞ্জনগর গ্রামের পাট চাষি মজনুর রহমান জানান, আমাদের মাঠের মাটি মোটা। এখানে প্রতি বিঘা জমিতে পাট উৎপাদন হয় ১২থেকে ১৩ মণের মত। আবার এলাকায় নদী থাকাই পাটের জাগ ভালো হয়। এতে পাটের আশের রং ভালো আসে ও পাটকাঠিও ভালো থাকে। এতে পাট ও পাটকাঠির দাম ভালো পাওয়া যায়। প্রতি বিঘা জমিতে আমরা পাটকাঠি বিক্রি করি ৭-৮ হাজার টাকার মত। এবছর এক বিঘা জমির পাট চাষ করে তা জাগ দিয়ে ঘরে তুলতে ১৭ হাজার টাকার কাছাকাছি খরচ হয়ে যাচ্ছে। আর পাট বিক্রি করে টাকা জমছে আঠারো হাজারের মত। তাই এখন ভরসা পাটকাঠিতে।
পাটকাঠি ব্যবসায়ি শিমুলতলার জালাল উদ্দীন জানান, তিনি ১৫ বছর যাবত পাটকাঠির ব্যবসা করছেন। এলাকার পুকুরের পানিতে জাগ দেয়া পাটকাঠির চেয়ে নদীর পানিতে জাগ দেয়া পাটের পাটকাঠির কদর বেশি। এমনিতেই ব্যবসায়িরা বিঘা প্রতি পাঠকাঠি অনুমান দরে কিনে তা পরিষ্কার করে বিক্রি করেন। এখন পাটের চেয়ে পাটকাঠির দর বেশি এবং চাহিদাও অনেক বলে জানালেন এই ব্যবসায়ি।
পানচাষি আলমডাঙ্গার বড়গাংনী গ্রামের দাউদ হোসেন জানান, পানের চাষের ক্ষেত্রে বরজের জন্য পাটকাঠির বিকল্প নেই। পানের বরজ ঘেরা ছাউনি থেকে শুরু করে সারিবদ্ধ ভাবে পানের গাছ দাঁড় করিয়ে রাখতে পাটকাঠি লাগবেই। এমনও সময় আছে ভালমানের পাটকাঠির জন্য ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা বায়না করে রাখেন বরজের মালিকরা। একই কথা জানালের চুয়াডাঙ্গার বুরজুক গড়গড়ি এলাকার পানচাষি মালেক ও হান্নান।
পাট ব্যবসায়ী আব্দুল হান্নান মেম্বর জানান, আড়তে গত বছরের অনেক পাট মজুদ রয়েছে। দাম কম থাকায় লোকশানের জন্য তা বিক্রি করেননি। গতবছর ২৪শ’ থেকে ২৬শ’ টাকা পযর্ন্ত পাট কেনা হয়। অথচ সেই পাট এখন বিক্রি ১৮শ’ থেকে ১৯শ’ টাকায়। চলতি মৌসুমের শুরুতে নতুন পাট কেনা হয় ২০০০ টাকা মন। এখন তার বাজারদর চলছে ১৫শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা। অনেক ব্যবসায়িকে লোকসান গুনতে হবে। অনেকেই আবার পথে বসবেন।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শঙ্কর কুমার মজুমদার জানান, জেলায় এবার পাট চাষ হয়েছে ২২ হাজার হেক্টর জমিতে। চলতি মৌসুম জেলায় অনাবৃষ্টি ও শ্রমিক সংকটের কারনে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। বতর্মানে পাটের দাম কিছুটা কম হলেও তা যে কোন সময় বাড়তে পারে। তাছাড়া পাট চাষ করে পাটের আশ ছাড়িয়ে নেয়ার পর যে পাটখড়ি পাওয়া যায় স্থানীয়ভাবে তারও যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। আবার পাটখড়ির বাজার দরও ভালো। পাটখড়ি থেকেই জায়গা বিশেষ উৎপাদনের খরচ উঠে যায়। তাছাড়া আমাদের দেশে জ্বালানী হিসেবে, বাড়িঘর ও সবজি ক্ষেতের বেড়া, মাচা, পান বরজ, ইত্যাদি কাজে পাটকাঠির ব্যবহার দীর্ঘকাল আগে থেকেই হয়ে আসছে। পাটকাঠি অবশ্যই চাষিদের জন্য আশীর্বাদ।