পরিবারতন্ত্রে চলছে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি মেহেরপুর ইউনিট। একই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিগত ১৫ বছর ধরে চলমান এই কমিটি জড়িয়েছে নানা অনিয়মে। অনিয়মকে নিয়ম বানিয়ে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি মেহেরপুর ইউনিট নিজের দখলে রাখতে বিগত দিনে গোপনে ইউথ কমিটি, বিভিন্ন সময়ের অনুদান ও অর্থ আত্মসাৎ, বিতরণকৃত মালামাল গোডাউনজাত, ইউডিআরটি মেম্বারদের সরঞ্জাম ও অর্থ আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন ট্রেনিংয়ে আর সি ওয়াই মেম্বারদের বাদ দিয়ে নিজ নিকটীয় আত্মীদের অংশগ্রহণ করানোসহ নানা অভিযোগ রয়েছে এই কমিটির সাবেক যুব প্রধান ও বর্তমান মনোনীত এক্সিকিউটিভ সদস্য খন্দকার সামসুজ্জোহা সোহাগের বিরুদ্ধে।
যুব প্রধান থাকা সত্বেও এক্সিকিউটিভ সদস্য খন্দকার সামসুজ্জোহা সোহাগ সকল বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগও রয়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাসের ৬ তারিখে দুই বছরের জন্য যে ইউথ কমিটি গঠন করা হয়েছে সেই কমিটিতে সোহাগ প্রভাব খাটিয়ে তার মেজ ভাই শান্তকে যুব প্রধান, স্ত্রী সুরাইয়া ইয়াসমিনকে উপ-যুব প্রধান-১, রেডক্রিসেন্টের যুব পলিসি অনুযায়ী কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি কমিটিতে থাকতে পারবে না এমন নীতিমালা থাকলেও ছোট ভাই জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি খন্দকার জুলকার নাইন বায়েজিদকে উপ যুব প্রধান-২, শুভাকাঙ্খী কাজী মুরসালিন রহমানকে প্রশাসন, সংগঠন ও সদস্য সংগ্রহের বিভাগীয় প্রধান, শালিকা(স্ত্রীর বোন) নুসরাত জাহান জ্যোতিকে প্রশিক্ষণ ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের উপ-বিভাগীয় প্রধান, লাইব্রেরিয়ান সহকর্মী নাগর ইসলামকে দুযোর্গ ও মানবিক সাড়া প্রদানের বিভাগীয় প্রধান, সোহাগের স্থানীয় এলাকার শিশির আহমেদকে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগীয় প্রধান ও শালিকার নিকটতম বন্ধবী নূরানী আক্তারকে তহবিল সংগ্রহের উপ-বিভাগীয় প্রধান করে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে।
শুধু তাই নয় বাইরে যে কোন গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনিং থেকে সদস্যদের বঞ্চিত করে সোহাগের স্ত্রী, শালিকা ও তার দুই ভাইকেও অংশগ্রহণ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই পরিবারতন্ত্রের কারণে অনেক যোগ্য আর সি ওয়াইরা মনোকষ্টে রেডক্রিসেন্ট ছেড়ে যাচ্ছেন।
এছাড়াও সোহাগ যুব প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় করোনাকালীন সময়ে রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি মেহেরপুর ইউনিট টিকাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে দায়িত্বরত থাকা সদস্যদের টাকা আত্মসাৎ, বিতরণকৃত বিভিন্ন সামগ্রী সুষ্ঠভাবে বিতরণ না করে পণ্যগুলা ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করা, বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণকারী ভলেন্টিয়ারদের সম্পূর্ণ সম্মানী না দিয়ে ফাঁকা সীটে স্বাক্ষর করে নিয়ে বাকী অর্থ আত্মসাৎ করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি মেহেরপুর ইউনিটের একাধিক সদস্যর কাছ থেকে জানা গেছে, করোনাকালীন সময়ে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি মেহেরপুর ইউনিট টিকাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। এসময় দায়িত্বরত থাকা সদস্যদের বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি থেকে ১৫০ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ১৫০ টাকা করে প্রতিদিন সম্মানী দেওয়ার কথা থাকলেও ইউথ ভলেন্টিয়ারদের পেমেন্ট সিটে ৩০০ টাকা করে সাইন করে নিলেও দেওয়া হয়েছে নামমাত্র ১৫০ টাকা। মেহেরপুর ইউনিটে যে সকল সামগ্রী এসেছে তার সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা হয়নি। এমনকি করোনা চলে যাওয়ার পরে সাধারণ মানুষের জন্য যে পণ্যগুলা বরাদ্দ এসেছিল তা ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করে ফেলে দেওয়া হয়েছে। শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণের বরাদ্দ আসলেও সেগুলো চেয়ারম্যান, সেক্রেটারিসহ কমিটির মেম্বাররা ভাগ করে নিজের আত্মীয়-স্বজন ও নিজের দলের লোকজনের মাঝে বিতরণ করছে। নিয়ম অনুযায়ী মাস্টাররোলে সুবিধাভোগীরা সহি বা টিপসহির মাধ্যমে মালামাল গ্রহণ করার কথা থাকলেও তা ভলেন্টিয়ারদের দিয়ে সহি বা টিপসহি করানো হয়েছে। বিগত ছয় থেকে সাত মাস আগে মেহেরপুর ইউনিটে নার্সিং উপবৃত্তি প্রোগ্রাম আসে। প্রোগ্রামের বিষয়টি সকলকে অবগতও করা হয়। এসময় নার্সিংয়ের কয়েকজন ভলেন্টিয়ার উপবৃত্তির ফরম পূরণ করতে গেলে প্রকৃত উপবৃত্তি পাওয়া ভলেন্টিয়ারদের বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সোহাগ তার শালিকা জ্যোতিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে নার্সিংয়ে ভর্তি করে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করে দেয়। ১০ দিনের হিট অ্যাকশন প্রোগ্রামে সকল আর সি ওয়াই দের প্রতিদিন ৫’শ টাকা করে টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে ১০০ টাকা করে। অথচ ফাঁকা পেমেন্ট সিটে দায়িত্বরত সকলের স্বাক্ষর নিয়ে বাকী ৪’শ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আর সি ওয়াই জানান, দীর্ঘদিন ধরে মেহেরপুর রেড ক্রিসেন্ট একই পরিবারের কাছে বন্দী। এ যেনো পরিবারতন্ত্রে পরিণত হয়ে গেছে। নতুন যে কমিটি করা হয়েছে সে সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। আমরা দীর্ঘ প্রায় এক যুগ ধরে এই সংগঠনে শ্রম দিয়ে গেছি। আমাদের কোন মূল্যায়ন হয়নি বরং লাঞ্চিত হয়েছি ওখানে আমরা। এর আগে কমিটি হলে সিনিয়র হিসেবে আমাদের চিঠি দিয়ে জানানো হলেও এবারের বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। যাকে যুব প্রধান করা হয়েছে সে সোহাগের মেজ ভাই। ভালো ভালো পদগুলো সবই সোহাগের পরিবারের লোকজনকে দেওয়া। এছাড়াও ঢাকা থেকে যে সকল ট্রেনিং আসে সেখানে শুধুই সোহাগের ভাই আর শালিকা ছাড়া কেউ পাই না। করোনার সময় আমরা অনেক শ্রম দিয়েছি। সেখানেও আমাদের সম্মানীর টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে কিন্তু সংগঠনের সম্মানের কথা ভেবে আমরা কিছুই বলিনি।
এবিষয়ে ইউএলও সাব্বির হোসেন জানান, আমি নতুন এসেছি। এই কমিটি সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারব না। এই কমিটির অধিকাংশ সদস্যকেই আমি চিনি না। হিট অ্যাকশন প্রোগ্রামে আমি থাকলেও আর সি ওয়াইদের পেমেন্টের বিষয়ে আমার জানা নেই। ওই প্রোগ্রামের সময়ই আমি জয়েন করেছি। এবিষয়ে জানতে সাবেক যুব প্রধান ও বর্তমান মনোনীত এক্সিকিউটিভ সদস্য খন্দকার সামসুজ্জোহা সোহাগের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার জন্য কল ও এসএমএস দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।