শত গান, কবিতা, নাটক, নৃত্য প্রভৃতির মধ্য দিয়ে জাতিসত্তার জাগরণে জাতি রাষ্ট্র গঠনের দৃঢ় ভূমিকা পালনের মধ্যে দিয়ে আমরা এগোতে থাকি। সেই সমান্তরাল কিংবা বন্ধুর রেখা ধরে ছাত্র, শ্রমিক, জনতা আন্দোলনে যে আকাঙক্ষা ব্যক্ত করে যে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে এবং ধাপে ধাপে আমরা পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক সমন এর বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অবশেষে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় অর্জিত হয়। আমরা এক স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আত্মপরিচয় খুঁজে নিতে সক্ষম হই।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ মূলক সাংস্কৃতিক অভিঘাত ছিল মারাত্মক হিং¯্র। যেমন সে সময়কার পশ্চিম পাকিস্তানের পাঠান, বেলুচ, সিন্ধি, পাঞ্জাবী জাতিগোষ্ঠীর উৎপাদিত বাঙালির প্রতি ঘৃণা বিদ্বেষ মূলক সংস্কৃতি সংক্রামিত করতে পেরেছিল। কি ছিল সেই সাংস্কৃতির ভাষ্য? ছিল বাঙালি জাতি বলতেই সব হিন্দু, কাফের, বিধর্মী তাদেরকে হত্যা করা জায়েজ, নিপিড়ন-নির্যাতন করার মনেজাগতিক সংস্কৃতি তাদেরকে সংহত করেছিল এবং সে কারণেই নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালি হত্যা, নির্যাতন, ভয়াবহতম শিশু ও নারী নির্যাতন, ধর্ষণ করেও তাদের মধ্যে কোন পাপবোধ জাগ্রত হয়নি। ক্ষেত্রবিশেষ উল্লাস আনন্দ চিত্তে তারা এসব করতে পেরেছিল। তেমনি ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিজয়ের পর একই রূপে বিদ্বেষ মূলক মনোজাগতিক সংস্কৃতির ফলস্বরূপ ক্ষেত্রে বিশেষ নিরীহ বিহারী সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন ও হত্যাকে মেনে, মানিয়ে ও বৈধ্যত্ব দেওয়াকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল।
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে আমরা দেখি জাসদের গণবাহিনী, পূর্ব বাংলার সর্বহারাপার্টি বা গোপন কমিউনিস্ট পার্টি সমূহের কর্মীদেরকে ঢালাও ভাবে ডাকাতির সাথে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচিতি দেয়ার একটি বিদ্বেষ মূলক সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছিল সুপরিকল্পিত ভাবে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছিল। এবং এই হত্যাকে দেশের সার্বভৌমত্বের সাথে প্রাসংঙ্গিক বলে প্রচার করা হয়েছিল। সমাজে এরকম একটি মিথ তৈরি করা হয় যে মানুষ মারা হয়নি ডাকাত মারা হয়েছে। এরকম একটি তথ্য আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ১০ মার্চ গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন-ন্যাপ মনোনীত প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড কমলেশ বেদজ্ঞ, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সম্মুখ সমরে বীরযোদ্ধা কমিউনিস্ট পার্টি অবিভক্ত ফরিদপুর জেলা কমিটির সদস্য, গোপালগঞ্জ মহকুমার সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা জনমানুষের প্রিয় নেতা কমরেড ওয়ালিয়ার রহমান লেবু, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মুক্তিযোদ্ধা বিষ্ণুপদ কর্মকার এবং মানিক ভট্টাচার্য্য কে নির্মমভাবে কুখ্যাত হেমায়েতের নেতৃত্বে হত্যা করা হয়। দুঃখজনকভাবে মর্মান্তিক এই হত্যাকান্ডকে জায়েজ করা ও হালকা করার প্রয়াসে ১২ই জানুয়ারি বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান দৈনিক মইনুল হোসেন সম্পাদিত পত্রিকা ইত্তেফাকের সংবাদের হেডলাইন ছিল “ফরিদপুরের পল্লীতে গণপিটুনিতে চার ডাকাত নিহত” পরিষ্কারভাবে মানুষের মধ্যে এই মেসেজ দেওয়া হলো মানুষ না মারা হয়েছে ডাকাত। একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় এভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক সাংস্কৃতিক অপকৌশল ব্যবহার করে হত্যার সংস্কৃতিকে জাতির সামনে নমনীয় ভাবে উপস্থাপন নিশ্চই এক ধরনের বিদ্বেষ…চলবে