”ইতিহাস যখন আলো ছড়ায়, কিছু মন তা ঘোলাতে চায়” ইতিহাসের পাতায় কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলো শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো একটি সভ্যতার নির্মাণশিল্পী। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর পবিত্র সম্পর্ক তেমনই এক আলোকবর্তিকা, যেখান থেকে উদ্ভাসিত হয় ভালোবাসা, প্রজ্ঞা ও নবুয়তির আলো।
তবুও আজ কিছু তথাকথিত “বিচারক” এই সম্পর্ককে মাপতে চায় তাদের পশ্চিমা পরিমাপে, যেখানে ইতিহাসের আলোকে ঢেকে দিতে চায় আধুনিকতার নামে গজিয়ে ওঠা মিথ্যার ছায়া। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, আলো যতই আড়াল করা হোক, সে তার দীপ্তি হারায় না।
ঐতিহাসিক বাস্তবতা: বাল্যবিবাহ নয় এটি ছিল সামাজিক স্বাভাবিকতা। ৭ম শতকের আরব উপসাগরীয় অঞ্চল তো বটেই, একই বাস্তবতা ছিল ইউরোপ, ভারতবর্ষ ও আমেরিকার মতো সভ্য সমাজেও। ইংল্যান্ডের রানী মার্গারেট বিউফোর্ট ১২ বছর বয়সে মা হয়েছিলেন। ইউরোপে আট-নয় বছরেই বিবাহ ছিল প্রচলিত। এমনকি বিংশ শতাব্দীর শুরুতেও আমেরিকার বহু রাজ্যে ১০-১৪ বছর বয়সে বিবাহ ছিল সম্পূর্ণ বৈধ।
তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় যে বাস্তবতা পশ্চিমা সমাজ নিজের অতীতে ধারণ করেছিল, তা মুসলিম ইতিহাসে ঘটলেই কেন তা “অপরাধ” বলে বিবেচিত হবে?
প্রাকৃতিক বাস্তবতা: আরবের আগাম পরিপক্বতা, আরবের উত্তপ্ত ও শুষ্ক আবহাওয়ায় মানসিক ও শারীরিক পরিপক্বতা আসে প্রাকৃতিকভাবেই দ্রুত। হযরত আয়েশা (রাঃ) নিজেই বলেন, “আমি ভালো-মন্দ বুঝতাম, তখনই নবীজি ﷺ-এর ঘরে গিয়েছিলাম।” এ সম্পর্ক ছিল না কোনো জোরজবরদস্তির ফল। বরং পারিবারিক সম্মতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, এবং ভালোবাসার নিখাদ বন্ধনে গাঁথা এক অনন্য অধ্যায়। আর রাসূল ﷺ ছিলেন এমনই স্বামী, যিনি স্ত্রীদের অনুভব, মত ও ব্যক্তিত্বকে দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ সম্মান।
আয়েশা (রাঃ): জ্ঞানের দীপ্ত মশাল হযরত আয়েশা (রাঃ) কেবল নবী-পত্নী নন, বরং ছিলেন নববী শিক্ষার এক জ্যোতির্ময় বাহক। তিনি একাই বর্ণনা করেছেন প্রায় ২২০০ হাদীস, যার অধিকাংশই রাসূল ﷺ-এর ঘরোয়া জীবন, ইবাদত, আখলাক ও নারী অধিকার সংক্রান্ত। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল প্রখর বুদ্ধিমত্তার প্রতীক। তিনি সাহাবিদের শিক্ষক, নারীদের মুরব্বি, ফিকহ ও হাদীসের প্রাজ্ঞ শিক্ষিকা। তাঁর ঘর ছিল এক চলমান মাদ্রাসা, তাঁর হৃদয় ছিল এক উদার বিশ্ববিদ্যালয়।
পশ্চিমা মিডিয়া ও নারীবাদের দ্বিচারিতা, যারা আজ “শিশুবিবাহ” বলে শোরগোল তোলে, তারাই আবার ১৩ বছরের কিশোরীদের দিয়ে বানায় বিজ্ঞাপন, সিনেমা ও সোশ্যাল কনটেন্ট—যেখান থেকে উপার্জন হয় কোটি কোটি টাকা। তারা একদিকে নারীকে “স্বাধীনতা” দিচ্ছে বলে দাবি করে, অন্যদিকে সেই নারীকেই করে পণ্যে পরিণত।
এই দ্বিচারিতা আসলে এক “মৌন ঔপনিবেশিকতা” যেখানে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিকে একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, আর বাকি ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে বানানো হয় ‘বিতর্কের বিষয়’। রাসূল ﷺ: নারী-মর্যাদার শ্রেষ্ঠ রক্ষক। রাসূল ﷺ কেবল একজন প্রেমিক স্বামী ছিলেন না, তিনি ছিলেন নারী-সম্মানের অগ্রদূত। তিনি ২৫ বছর বয়সে বিবাহ করেন ৪০ বছরের খাদিজা (রাঃ)-কে। অধিকাংশ স্ত্রীই ছিলেন বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত। শুধু হযরত আয়েশা (রাঃ) ছিলেন কুমারী। আর এই সম্পর্ক ছিল হিকমতপূর্ণ, নারী শিক্ষার নবদিগন্ত উন্মোচনের এক পরিকল্পিত সূচনা।
এই বিবাহের মাধ্যমে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল যেখানে নারীর জ্ঞানচর্চা, নেতৃত্ব ও আত্মমর্যাদার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
এ আলো নিভে না, হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বিবাহ কোনো বিতর্ক নয়, বরং তা ভালোবাসা, হিকমত ও নবুয়তির আলোয় গাঁথা এক ঐতিহাসিক সত্য। এই আলো নিভে না, এটি জ্বলে হৃদয়ে, ইতিহাসে, হাদীসে, হিকমতে। আজ যারা এই সম্পর্ককে কলঙ্কিত করতে চায়, তারা শুধু ইতিহাসের নয়, মানবতার হৃদয়েও আঘাত করছে। তাদের জবাব দিতে হবে সাহিত্য দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে। “এ আলো নিভে যাবে না, কারণ এ আলো সত্যের এ আলো আয়েশা (রাঃ)-এর।”
মুফতি সাইফুল্লাহ আজহারী
গবেষক ও ইসলামি চিন্তাবিদ
ইসলামিক রিচার্জ সেন্টার, জামিয়া ইসলামিয়া ফারুক্বিয়া, ঢাকা