বাংলাদেশে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ তামাক। বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৫ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত রোগে ভোগেন। টোব্যাকো এটলাসের তথ্য অনুসারে তামাকজনিত রোগে প্রতি বছর ১ লক্ষ ৯৯ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করে।
পরোক্ষ ধূমপানের কারণে দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ৬১ হাজার শিশু রোগাক্রান্ত হয়। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণ অত্যাবশ্যক। আর এর জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন। সম্প্রতি নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ দেশের মানুষকে নতুনভাবে আশান্বিত করেছে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। নতুন সরকার অন্যান্য অধ্যাদেশের পাশাপাশি তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটিকে আইনে রুপান্তরিত করার জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি আরো শক্তিশালি করে আইনে পরিণত করার দাবি জানাচ্ছি।
আজ সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন দেশের খ্যাতনামা ১৪ জন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
বিবৃতিতে তারা বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা বিবেচনায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালীকরণে সরকারের উদ্যোগকে ব্যহত করতে তামাক কোম্পানি বরাবরের মতো নানা বিভ্রান্তকর ও মিথ্যা প্রচারণা চলাচ্ছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইন ও নীতি প্রণয়ন ও সরকারের অন্যান্য পদক্ষেপকে ব্যহত করতে তামাক কোম্পানিগুলো সব সময় এ ধরণের অপকৌশল গ্রহণ করে থাকে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালী হলে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাবে বলে তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত তথ্য হলো ২০০৫ সালে সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাস করে। ২০১৩ সালে সংশোধনের মাধমে আইনটিকে আরো শক্তিশালী করা হয়। ফলে ২০০৯ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে দেশে তামাক ব্যবহার প্রায় ১৮% কমেছে (গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোবাকো সার্ভে)। কিন্তু তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ও কর ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধির ফলে গত ২০ বছরে এই খাত থেকে রাজস্ব আয় বেড়েছে ১৪ গুণ। প্রতি বছর এই খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে বেশি ছিলো। যদিও আধুনিক রাষ্ট্র চিস্তায় রাজস্ব আয় কখনোই জনস্বাস্থ্য এবং মানুষের মৃত্যুর চেয়ে ‘বড়’ বিবেচ্য হতে পারে না।
বিবৃতিতে তারা আরও বলেন, তামাক কোম্পানি একটি প্রাণঘাতী পণ্যের ব্যবসা করে মুনাফা অর্জনের জন্য। মানুষের মৃত্যু বা ক্ষতি তাদের বিবেচ্য নয়। মিথ্যাচারের মাধ্যমে তারা প্রকৃত সত্যকে আড়াল করছে। শিশু-কিশোরদের তামাকের নেশায় আকৃষ্ট করতে তারা বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে ধূমপানের স্থান তৈরি করে দিচ্ছে, মূল্য বৃদ্ধি ও খুচরা শলাকা বিক্রি বন্ধের উদ্যোগকে ব্যহত করছে, বিক্রয় স্থলে আগ্রাসী বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, দেশে ভেপিং ও ই-সিগারেটের ব্যবহার বাড়াতে যুবকদের নিয়ে গোপনে ভেপিং মেলার আয়োজন করছে, আইন শক্তিশালি করতে কার্যকর প্রস্তাবসমূহের বিরোধিতা করছে যা তরুণ প্রজন্মকে তামাকে আসক্ত করার মাধ্যমে স্বাস্থ্য ধ্বংসের পায়তারা।
সংশোধিত আইনে সিগারেটের খুচরা শলাকা বিক্রি বন্ধ এবং তামাকজাত দ্রব্য বিক্রির জন্য আলাদা লাইসেন্স গ্রহণের বিধান যুক্ত করা হলে আইনটি আরো শক্তিশালি ও কার্যকর হয়ে উঠবে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। এমতাবস্থায় তামাক কোম্পানির ভ্রান্ত প্রচারণা থেকে সতর্ক থাকা এবং দেশের মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষায় ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটিকে আরো শক্তিশালী করে আইনে পরিণত করতে আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বিবৃতিতে মোট ১৪ জন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ স্বাক্ষর করেন। তারা হলেন, বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক; বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক্স চেয়ারম্যান ও মেডিকেল স্টাটিস্টিকস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল হক; নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্টঅব পাবলিক হেলথের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দীপক কুমার মিত্র, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপ-উপাচার্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. নওজিয়া ইয়াসমীন ও ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোঃ আনোয়ার হোসেন; ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল এবং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিভাগীয় প্রধান (এপিডেমিওলজি) জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাঃ সোহেল রেজা চৌধুরী; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ মাহফুজুল হক; স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ডা. খালেদা ইসলাম; বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সাইন্সেসের ডিপার্টমেন্ট অবে অকুপেশনাল এন্ড এনভাইরনমেন্টাল হেলথের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এম. এইচ. ফারুকী ও অসংক্রামক রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পলাশ চন্দ্র বনিক; হেলথ এন্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী; চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল এবং আর্ক ফাউন্ডেশনের সিনিয়র রিসার্চ ম্যানেজার জুনায়েদ আল আযদী ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ডা. দীপা বড়ুয়া।