ইসলামের উত্তরাধিকার আইন বা ফারায়েয কোনো একপাক্ষিক বৈষম্যমূলক বিধান নয়; বরং এটি একটি দায়িত্বনির্ভর, ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা।
কুরআনের আয়াত “لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ” (নিসা: ১১) ছেলের জন্য মেয়ের দ্বিগুণ অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে এই আয়াতটিকে খণ্ডিতভাবে তুলে ধরে অনেকেই ইসলামকে ‘নারীবিদ্বেষী’ দেখাতে চান। অথচ বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।
বুঝতে হবে বিধানের প্রেক্ষাপট: এই বিধান প্রযোজ্য তখনই, যখন মৃত ব্যক্তি পুত্র ও কন্যা উভয়কে রেখে যান। অন্য বহু ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান পায়, আবার কখনো মেয়ে বেশি পায়। উদাহরণ: সম্পর্ক পুরুষ – নারী, পিতা-মাতা (সন্তান থাকলে) ১/৬ ভাগ, স্বামী/স্ত্রী ১/২ বা ১/৪, ১/৪ বা ১/৮ ভাগ। একমাত্র কন্যা প্রযোজ্য নয় ১/২ ভাগ। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আত্মীয় পুরুষ পান না, অথচ নারী পান।
কেন ছেলেকে দ্বিগুণ? ইসলামে উত্তরাধিকার মানে শুধুই ভোগ নয়, বরং তা দায়িত্ব পালনের উপযোগী প্রস্তুতি।
কারণ: (ক) স্ত্রীকে দেনমোহর দিতে হয়, (খ) পরিবারের সম্পূর্ণ ভরণপোষণ তার দায়িত্ব, (গ) সন্তানের খরচ, এমনকি বাবা-মায়ের খরচও তার দায়িত্ব, (ঘ) নারী তার প্রাপ্ত সম্পদে পূর্ণ স্বাধীন তাকে ব্যয় করতে হয় না। অতএব, দ্বিগুণ সম্পদ দেওয়া মানে “বিশেষ সুবিধা” নয়, বরং “বিশেষ দায়িত্ব” পালনের উপযোগী করে তোলা।
জীবিত অবস্থায় যেখান থেকে নারী পায়, পুরুষ পায় না: মাহর (দেনমোহর) স্বামীর সম্পদ (উত্তরাধিকার) ভরণপোষণ, অলংকার, উপহার
সমতা নয়, ইসলাম চায় ন্যায়বিচার: সমতা মানে সবাইকে সমান দেওয়া। ন্যায়বিচার মানে যার দায়িত্ব বেশি, তাকে বেশি দেওয়া। ইসলাম “ইকুইটি” বা ন্যায়ের ভিত্তিতে সমাজ গঠন করে। আধুনিক প্রেক্ষাপটে এ বিধান কতটা কার্যকর? (ক) আজও নারীর ভরণপোষণ স্বামীর দায়িত্ব, (খ) দেনমোহর, নিরাপত্তা, অলংকার সবই পুরুষের ওপর, (গ) নারী পারিবারিক খরচে বাধ্য নয়। গবেষণায় দেখা যায় পুরুষের ব্যয় জীবদ্দশায় নারীর তুলনায় বহুগুণ বেশি। মেয়েরা কম পায় না বরং বেশি কিছু পায়: দায়িত্বমুক্তি, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সম্পদের ওপর পূর্ণ স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা। এগুলো এমন সুফল, যা আধুনিক কোনো ব্যবস্থাও নারীকে নিশ্চিত করতে পারেনি।
“ছেলে দ্বিগুণ পায়, মেয়ে একভাগ” এ কথা খণ্ডিত। কখনো নারী কম পায়, কখনো সমান পায়, কখনো বেশি পায়, কখনো একাই পায় আর তার সম্পদে সে স্বাধীন। কিন্তু ছেলে সম্পদ পেলেও তার বিনিময়ে দায়িত্বও বহন করতে হয়। ইসলামে উত্তরাধিকার লিঙ্গবৈষম্য নয় এটি দায়িত্বভিত্তিক ন্যায়বিচার।
মুফতি সাইফুল্লাহ আজহারী
অধ্যক্ষ, জামিয়া ইসলামিয়া ফারুক্বিয়া, ঢাকা।