• শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:১২ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
বিএটিবির দাম কমানোর প্রস্তাবে রাজি হলে সিগারেটে রাজস্ব কমবে ২২০০ কোটি টাকা হেঁটে যাই বিদ্যালয়, দেহ-মন সুস্থ রয় শীর্ষক কার্যক্রমের উদ্বোধন গাংনীতে ১৯ লাখ টাকার ভারতীয় মালামাল উদ্ধার গাংনীতে উপজেলা জামায়াতের কার্যালয়ের নিচে ব্যাগ দেখে বোমা আতঙ্ক: ব্যাগে মিলল গমের ময়দা গাংনীতে সার বহনের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে চালকের জরিমানা মুজিবনগরে অনলাইন জুয়ার এজেন্ট শামীম গ্রেফতার নড়াইলে ৯ কার্যদিবসে ৫ বছরের শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ঘাতকের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কলকাতায় হোটেলে অগ্নিকান্ডে সন্তানসহ কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দম্পতি নিহত মেহেরপুরে মেধাবী শিক্ষার্থীদের জেলা পরিষদের বৃত্তি প্রদান গাংনীতে ৪ পিস ইয়াবাসহ যুবক আটক: জেল-জরিমানা

মেহেরপুরে কৃষকের মাঝে বিভিন্ন ফসলের প্রদর্শনীর নামে অর্থ হরিলুট

বিবর্তন প্রতিবেদক
Update : রবিবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৪
মেহেরপুরে কৃষকের মাঝে বিভিন্ন ফসলের প্রদর্শনীর নামে অর্থ হরিলুট
মেহেরপুরে কৃষকের মাঝে বিভিন্ন ফসলের প্রদর্শনীর নামে অর্থ হরিলুট

অনিয়ম ও দূর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে মেহেরপুর সদর উপজেলা কৃষি অফিস। কৃষি খাতে কৃষকদের মাঝে বিভিন্ন ফসলের প্রদর্শনী দিয়ে হরিলুট করা হয়েছে অর্থ। ভুক্তভোগীদের ন্যায্য উপকরণ থেকে বঞ্চিত, প্রকৃত কৃষকদের বাদে দলীয়করনের মাধ্যমে প্রদর্শনী দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মেহেরপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। এসব অনিয়মের হাত থেকে রেহায় পায়নি জনপ্রতিনিধিরাও।

মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র। বিভিন্ন প্রকল্পে ফসলের প্রদর্শনীতে কি ধরণের সুযোগ-সুবিধা আছে তা জানতে বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা কৃষি অফিসে গেলে তাদের কোন সহযোগিতা না করায় প্রায়ই বাকবিতন্ডার সৃষ্টি হয় এবং হুমকি ধমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন বেশ কয়কেজন কৃষক।

তবে এসব অভিযোগ আর অনিয়মের বিষয়ে ২০২৩-২৪ এবং ২৪-২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন প্রকল্পের প্রদর্শনীপ্রাপ্ত কৃষকদের তালিকা এবং তাদের বরাদ্দের তথ্য গত ২৫ দিনেও দেয়নি সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান। প্রকল্পের ওয়েবসাইটেও মেহেরপুরের প্রদর্শনীপ্রাপ্ত কৃষকদের তালিকা এবং কত টাকা বরাদ্দ এসেছে তার কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

সাবেক সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, একেক প্রকল্পের একেক ধরন। সব মিলিয়ে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ প্রদর্শনী আসে তার সময়। কোনটি প্রদর্শনীতে ৫ শতক, ১০ শতক আবার কোনটিতে ২০ শতক আছে, কোনটা এক বিঘাও আছে। প্রকল্পের বরাদ্দেও বেশ পার্থক্য থাকে। সাধারণত মে থেকে জুনের মধ্যে বরাদ্ধ বেশি আসে। অর্থবছরের শেষের দিকে বরাদ্ধ বেশি আসে। বিভিন্ন মৌসুম যেমন রবি আছে, খরিপ-১ ও ২ আছে। আমি মেহেরপুর থেকে চলে আসার পর পরবর্তীতে কি হয়েছে সেটা আমি জানি না। কুলের চারা আমার সময় দেওয়া হয়নি। কারণ এই প্রদর্শনীগুলো পরে আসছে। বরি মৌসুমে কুলের চারা নেই। ফল বাগান আছে খরিপ-১ ও ২ তে।

প্রতি জেলায় একই বরাদ্দ হওয়ায় যশোর অঞ্চলের টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ফসলের প্রদর্শনীপ্রাপ্ত কৃষকদের জন্য দেওয়া বরাদ্ধের তালিকায় দেখা যায় সেখানে ২০ শতাংশ জমির জন্য কুল চাষে সার, কীটনাশকসহ আনুসাঙ্গীক খরচ ১৫ হাজার ৮শ টাকা, ট্রাইকো কম্পোষ্ট প্রদর্শনীতে রিং ও স্লাব, সেড নির্মাণসহ, আনুসাঙ্গীক খরচ ২০ হাজার টাকা, ড্রাগন প্রদর্শনীতে ১০ শতক জমির জন্য বীজ, সারসহ আনুসাঙ্গীক খরচ ৩০ হাজার ৮শ টাকা, টমেটো প্রদর্শনীতে সারসহ আনুসাঙ্গীক খরচ দিয়ে ২১ হাজার ৭শ টাকা বরাদ্দ দেখা যায়।

উপরোক্ত একই প্রদর্শনীতে যশোরের থেকে মেহেরপুরের চিত্র ভিন্ন। মেহেরপুর সদর উপজেলার হরিরামপুর গ্রামের ইউপি সদস্য আশাদুল হক ৬ বিঘা জমি লিজ নিয়ে ৩ বছরের জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা খরচ করে কুল চাষ করেছেন। তিনি পেয়েছেন ২টি প্রদর্শনী। হিসেব অনুযায়ী ১৫ হাজার ৮শ টাকা করে ২টি প্রদর্শনীতে তার বরাদ্দ আসে ৩১ হাজার ৬শ টাকা। সব কিছু মিলিয়ে ২ হাজার টাকা করে ২টি প্রদর্শনীতে এখন পর্যন্ত তিনি ৪ হাজার টাকার মতো উপকরণ পেয়েছেন।

আশাদুল হক বলেন, আমি জনপ্রতিনিধি হিসেবে বলতে পারবো না যে আমার প্রদর্শনীতে কত টাকা আমার জন্য বরাদ্দ এসেছে। আমরা ইউপি সদস্য হিসেবে যদি বলতে না পারি তাহলে সাধারণ চাষিদের কি অবস্থা হবে?। মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের জিজ্ঞেস করে কোন কিছু পায়নি আমরা। কেউ কিছু বলতে পারে না।

সদর উপজেলার রাজনগর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমসহ মো: শাহাজাহান, রোজিনা খাতুন ৩ জনই মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রযুক্তির আওতায় ২৩-২৪ অর্থবছরের জুন মাসের ১৪, ১৫ ও ১৬ তারিখে ট্রাইকো কম্পোষ্টের প্রদর্শনী পেয়েছেন। এই প্রদর্শনী থেকে বায়োডার্মা সার, সেড নির্মাণ, সাইনবোর্ড ও রেজিষ্টার এবং শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ বাবদ তিন জনের ২০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও তাদের ভাগ্যে মিলেছে যতসামান্য মোট ৫-৬ হাজার টাকা ও নিন্মমানের উপকরণ। আর পাবেন কি না তাও জানেন না তারা। তাদের জানানো হয়নি কত টাকা বরাদ্দ আছে প্রদর্শনীতে।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সদর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে আমাদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল ট্রাইকো কম্পোষ্ট তৈরি করার জন্য। আমরা সব উপকরণ পায়নি। আমরা টিন, রিং আর খুটি পেয়েছি। এগুলো এতো নিন্মমানের যা কাজের অযোগ্য। আমরা যা উপকরণ পেয়েছি তা হয়তো ২ হাজার টাকার মতো হতে পারে। যে উদ্দ্যেশ্য নিয়ে আমাদের প্রদর্শনী দিয়েছিল তা পূরণ হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে সদর কৃষি অফিসের প্রতি আমাদের যে আস্থা সেটি আর থাকবে না।

সদর উপজেলার হিজুলি গ্রামের টমেটো চাষি ফারুক হোসেনের ছেলে আল আমিনের নামে প্রদর্শনীর জন্য বরাদ্দ আসে। সব উপকরণ দিয়ে তিনি এখন পর্যন্ত আনুমানিক ২ হাজার টাকার মতো উপকরণ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। আর কিছু পাবেন কি না তা জানেন না তিনি।

ফারুক হোসেন বলেন, আমাদের যে কত বরাদ্দ আসে আমরা তা জানি না। আমাদের কোন শীট দেখায় না। আমি সব মিলিয়ে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকার মত উপকরণ পেয়েছি। আমি বার বার জিজ্ঞেস করেও কিছু জানতে পারিনি।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শুধুমাত্র এই ৬টি প্রদর্শনীই নয় বিভিন্ন প্রকল্পের প্রদর্শনীতে সদর উপজেলার ১৬টি ব্লকের প্রদর্শনী প্রাপ্ত চাষিদের অধিকাংশের একই অবস্থা।

২০২২-২৩ অর্থবছরে পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্পের আওয়তায় প্রকল্প আসে সারা বাংলাদেশে। যার মধ্যে মেহেরপুরও ছিল। সেই প্রকল্পে প্রাদর্শনীর রক্ষাণাবেক্ষণ ও পূণ:স্থাপনের জন্য ২৩-২৪ অর্থবছরে পুনঃরায় ১৮৫ জনের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। কৃষি প্রযুক্তি গ্রাম প্রকল্পে সদর উপজেলা কৃষি বিভাগের রেজিষ্ট্রার খাতায় দেখা যায় রফিকুল ইসলাম, সাইমা খাতুন, আরিফুল ইসলাম সেই খাতায় স্বাক্ষর করে সমস্ত উপকরণ পেয়েছেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র পুরোটাই ভিন্ন। মেহেরপুর সদর উপজেলার ময়ামারি গ্রামের কাঞ্চন খাতুন। রেজিষ্ট্রার খাতার তথ্য বলছে, তার নাম সাইমা খাতুন। তার অভিযোগ তার নাম ও স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়েছে ঠিক। এসব উপকরণের বিষয়ে কিছুই জানেন না তিনি।

সদর উপজেলার রাজনগর গ্রামের রফিকুল ইসলামের অভিযোগও একই রকম। রেজিষ্ট্রার খাতায় কোন সাক্ষর করেন নি তিনি। একই অভিযোগ উত্তর শালিকা গ্রামের আরিফুল ইসলামের। তিনি বলেন, এই রকম কোন খাতায় তিনি স্বাক্ষর করেনি। এই সাক্ষরও তার না। আমার স্বাক্ষর অন্যরকম। কেউ এই সাক্ষর করে নিয়েছে। অনুসন্ধানে রেজিষ্ট্রার খাতার আরো বেশ কয়েকটি পাতার ছবি হতে আসে। সেখানেও দেখা যায় আরেক চিত্র। প্রদর্শনীপ্রাপ্ত ভুক্তভূগী চাষিরা কি কি উপকরণ পাবে তা না লিখেই ফাঁকা স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মাঠ দিবসের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৭ হাজার ৭শ টাকা। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে চাষিদের নিয়ে একই অনুষ্ঠানে একাধিক অনুষ্ঠানের ব্যানার পরিবর্তন করে অর্থ লোপাট করারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। জনপ্রতি চাষির জন্য নাস্তা বাবদ ৮০ টাকা বরাদ্দ থাকলেও নাম মাত্র ২০-২৫ টাকার নাস্তা দিয়ে অর্থ লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ চাষিদের।

বিভিন্ন গ্রামের আরো অনেক চাষি বলেন, প্রদর্শনীতে কি ধরনের সুযোগ সুবিধা আছে আমরা তা বলতে পারবো না। আমাদের কোন রিসিট দেওয়া হয় না। এখন আমাকে সীমিত করে দিয়ে যদি খাতায় সব কিছু দেওয়া হয়েছে বলে লিখে দেয় তাহলে তো দূর্নীতি হয়েছে। আমাদের অনুষ্ঠানগুলোতে ২০-২৫ টাকার মতো নাস্তা দেওয়া হয়। আমরা পরে জানতে পারি আমাদের বরাদ্দ আরো অনেক বেশি। আমরাসহ অনেক চাষি বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে তার কাছে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে জানতে গেলে আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। আমাদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। আবার একটা অনুষ্ঠানে একাধিক ব্যানার পরিবর্তন করে টাকা পয়সা লুটপাট করে কৃষি কর্মকর্তারা।

এদিকে মাঠ পর্যায়ে ফিল্ড কর্মকর্তারা বলছেন, প্রদর্শনীর বরাদ্দ কিংবা উপকরণের বিষয়ে কিছুই জানেন না তারা। চাষিদের তালিকা করে কৃষি কর্মকর্তার কাছে জমা দেয়। প্রদর্শনীগুলোতে কি কি উপকরণ কিংবা কি ধরনের সুযোগ সুবিধা আছে তাও জানি না। সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন কৃষি কর্মকর্তা।

একাধিকবার যোগাযোগ করার পর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, ইতিপূর্বে এই উপজেলাতে যত প্রদর্শনী বাস্তবায়ন হয়েছে সেগুলোও আমরা দেখভাল করার চেষ্টা করছি। কোন জায়গায় কোন ত্রুটি বিচ্যুতি হলে সেগুলো আমরা তদন্ত করছি। যদি কোন জায়গায় কোন অনিয়ম থাকে তাহলে সেগুলো দেখে ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে তিনি বিভিন্ন প্রদর্শনীর প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্ধ এসেছে তা এড়িয়ে যান।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিজয় কৃষ্ণ হালদার বলেন, তথ্য-উপাত্ত সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দেবে। আর কারো বিরুদ্ধে যদি কোন অভিযোগ থাকে তাহলে আমরা তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category