অভাবের সংসারে কাপড় বিক্রি করে দিন পার আর সন্তানের জন্য দুধ কেনার টাকা জোগাড় করতে না পারলেও দুই লাখ টাকার মাদকের মালিক হিসেবে এক দরিদ্র নারী কাপড় ব্যবসায়ীকে অভিযুক্ত করে মামলা দিয়েছে মেহেরপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বিদ্যুৎ বিহারী নাথ। মেহেরপুর শহরের মল্লিকপাড়ায় মাদক বিরোধী অভিযানে রেহানা খাতুন নামে এক নারীকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এর আগেও মানুষকে হয়রানি করার অভিযোগে কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে সংবাদও প্রকাশ হয়েছে।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় মেহেরপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে ওই নারীর বসত ঘর থেকে দুই লাখ টাকার মূল্যের হেরোইন উদ্ধার করে। হেরোইন উদ্ধারের ঘটনায় কাপড় ব্যবসায়ী নারী রেহানা খাতুন ও চঞ্চল নামের এক ব্যক্তিকে আসামী করে সদর থানায় এজাহার দায়ের করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। মাদক উদ্ধারের ঘটনাটি নাটকীয় অভিযান এমন অভিযোগ তোলেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীর পরিবার। এঘটনার পর এলাকায় নানা আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। রেহেনার বাড়ি থেকে মাদক উদ্ধারের একটি ভিডিও স্থানীয় কয়েকটি ফেইসবুক পেইজে প্রকাশ হলে নেটিজেনদের মাঝে শুরু হয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া। অধিকাংশ প্রতিক্রিয়ায় কাপড় ব্যবসায়ী রেহানাকে নির্দোষ দাবী করেছেন নেটিজেনরা।
মামলার এজাহারে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শহরের মিয়াপাড়া এলাকার সাহাদাৎ হোসেনের ছেলে চঞ্চল ভারতীয় সীমান্ত এলাকা হতে অবৈধ মাদকদ্রব্য হেরোইন সংগ্রহ করে মল্লিকপাড়ায় বসবাসরত তার খালা রেহানা খাতুনের বাড়িতে রেখেছে। মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের সহকারী উপপরিদর্শক মোঃ মিনারুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে রেহানা খাতুনের নিজ বাড়ি থেকে ৭১ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হয়। এসময় বাড়ির মালিক কাপড় ব্যবসায়ী নারী রেহেনা পালাতক ছিলেন বলে জানান তারা। উদ্ধারকৃত হেরোইন আনুমানিক দুই লাখ টাকা বলে মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের ওসি বিদ্যুৎ বিহারী নাথ জানান। বৃহস্পতিবার হেরোইন উদ্ধার নিয়ে সকালে মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের কাছে একটি প্রেস রিলিজ পাঠানো হয়।
অনুসন্ধানে গেলে এলাকাবাসী সাংবাদিকেদের জানান, বুধবার সন্ধ্যায় মেহেরপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি দল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার সময় কাউকে কিছু না জানিয়ে রেহানার বাড়িতে প্রবেশ করে। প্রবেশের কিছুক্ষণ পর তারা বাইরে এসে আশেপাশের লোকজন ডেকে রেহানার শয়নকক্ষে একটি প্লাস্টিকের র্যাকে থাকা কাপড়ের ভাঁজে লুকানো পলিথিনে মোড়ানো একটি হেরোইনের পোটলা উদ্ধার করে।
তাদের মতে খোলা বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মাদক উদ্ধার পুরো ঘটনাটি ছিল “নাটকীয় ও প্রশ্নবিদ্ধ”।
তারা জানান, রেহানা একজন দরিদ্র নারী। সে কাপড় বিক্রি করে তার জীবিকা নির্বাহ করে। তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে।
তবে এজাহারে দুইজনকে পলাতক দেখানো হলেও রেহানা খাতুন বাচ্চার জন্য দুধ কেনার জন্য কাপড় বিক্রির পাওনা টাকা আদায় করতে পাড়াতেই অবস্থান করছিলেন এবং চঞ্চল তার পায়ের চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতলে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
এছাড়াও ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে থেকে আবুল বাশার ও হাবিবুর রহমান রিন্টু নামের ব্যক্তিদের সাক্ষী হিসেবে এজাহারে দেখানো হয়। স্বাক্ষীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অভিযানের সময় সাথে নিয়ে রেহানার বসতবাড়িতে প্রবেশ করার কথা এজাহারে উল্লেখ থাকলেও ঘরে প্রবেশের সময় তারা ছিলেন না। অনেক পরে তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পরে তাদের সাক্ষী বানানো হয়।
অন্য দিকে মাদকের মালিক হিসেবে আসামী করা চঞ্চলের বিরুদ্ধে বিগত দিনে মাদক সংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে চঞ্চল বর্তমানে মাদক ব্যবসা থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে নিজ এলাকায় একটি মুদি দোকান দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে জানান। ঘটনার দিন তিনি পায়ের চিকিৎসা নিতে কুষ্টিয়ায় অবস্থান করছিলেন। মাদক ব্যবসা থেকে ফিরে আসার কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর তার কাছে বিশেষ সুবিধা না পাওয়ায় প্রতিপক্ষ লোক দিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলেও জানান তিনি। খালা রেহানা ও পরিবারের অন্যান্যদের সাথে দীর্ঘদিন ধরে তার কোন সম্পর্ক নেই। তিনি পরিবার নিয়ে অন্যত্র বসবাস করেন।
এবিষয়ে রেহানা খাতুন বলেন, আমি বাড়িতে ছিলাম না। আমার বাচ্চার দুধ কেনার টাকা ছিলো না তাই বিকেলে পাড়ায় একজনের কাছে টাকা চাইতে গিয়েছিলাম। এসময় বাড়ির দরজা ছিটকানি না দিয়ে খোলা রেখেই গিয়েছিলাম। পাড়া থেকে এসে একজন মহিলার কাছে শুনলাম বাড়িতে পুলিশ এসেছে। আমিতো এইসব কাজ কখনও করিনি, হেরোইন কি জিনিস আমি চিনি না। আমি কাপড় বিক্রি করে খাই। একজনও বলতেই পারবে না আমি এসব কাজ করি। আমি ১৫ বছর ধরে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাপড় বিক্রি করি। সংসারে অভাবের কারণে আমি আমার বাচ্চার দুধ-সুজি কেনার টাকা পাইনি। প্রশাসন যাচাই করুক, যদি প্রমাণ করতে পারে আমাকে যে সাঁজা দেবে মেনে নেব।
বাড়ি মালিকের অনুপস্থিতিতে অভিযান পরিচালনার বিষয়ে মেহেরপুর আদালতের অ্যাডভোকেট সেলিম রেজা কল্লোল জানান, বাড়ি মালিকের অনুপস্থিতিতে তার বাড়িতে প্রবেশ করে অভিযান পরিচালনা করতে চাইলে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, কাউন্সিলর, মসজিদের ইমাম ও শিক্ষক এমন মানুষদের সাথে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা যাবে। তবে অধিকাংশ অভিযান শেষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরোপুরি ঘটনা জানেই না এমন মানুষকে ডেকে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর নিয়ে আদালতে চার্জশিট জমা দেন। আদালতে উপস্থিত হওয়া সাক্ষীদের কাছে এমন ঘটনার কথা আদালতে শোনা যায়।
মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের ওসি বিদ্যুৎ বিহারী নাথ জানান, সম্পূর্ণ অন রেকোর্ডে লাইভে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। একটা বাড়িতে এতো টাকার মালমাল রেখেছে সেটা উদ্ধার করেছি। এই মাদক কত লোকজনকে মাদকের দিকে ধাবিত করতো। কিছু মানুষ আমাদের কাজকে বিতর্কিত করে মাদক ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিতে চাচ্ছে।