ঝলমলে বাইরের ভেতর ঝাঁপসা আমি, সব কিছুই ঠিকঠাক চলছে ফেসবুকে ফলোয়ারের বৃষ্টি, ইনস্টাগ্রামে চকচকে ছবি, টিকটকে ঝাঁকুনিময় হাসি। তবুও বুকের কোথাও জমে ওঠে এক ধরনের শূন্যতা। হৃদয় থাকে নিঃশব্দ, মন যেন ডেড চার্জে! আমরা এখন বেঁচে আছি এক ‘ডিজিটাল ঘোর’-এ যেখানে শরীর সচল, কিন্তু মন নিঃসাড়। চোখ খোলা, তবুও ঘুমিয়ে আছে আত্মা। এ এক আধুনিক নিঃসঙ্গতা, প্রযুক্তির আলোয় মুখ দেখানো, কিন্তু ভিতরে গভীর অন্ধকার।
প্রযুক্তি: নেয়ামত, না নেশা? যুক্তি নিঃসন্দেহে এক অপার নিয়ামত। দূরত্বের দেয়াল ভেঙে দেয়, গতির সীমানা পেরিয়ে যায়, জ্ঞানের জানালা খুলে দেয় অনন্ত সম্ভাবনায়। তবুও কখনো কখনো এই নেয়ামতই নেশায় রূপ নেয়। “সময় বাঁচাতে” গিয়ে আমরা হারিয়ে ফেলি সময়ের সৌন্দর্য। সারাদিন থাকি অনলাইনে, আর অফলাইনে পড়ে থাকে মা-বাবার হাসি, প্রকৃতির ঘ্রাণ, আর নিজের মনের কথা। মনোবিজ্ঞানের চোখে ক্ষয়ে যাওয়া মানুষ।
গবেষণা বলে, প্রতিদিন তিন ঘণ্টার বেশি স্ক্রিনে ডুবে থাকলে: আবেগ হয়ে পড়ে নিস্তেজ, একাগ্রতা ভেঙে পড়ে, আনন্দ-বেদনা হয়ে ওঠে যান্ত্রিক। মানুষ তখন হাসে, কিন্তু হৃদয় বুঝে না। চোখে দেখে, কিন্তু মন ছুঁতে পারে না। বাঁচে, কিন্তু নিজেকে খুঁজে পায় না। এই ’emotional deadlock’-ই তো ডিজিটাল ঘোরের ছায়াময় কারাগার। নতুন যুদ্ধ: মন যখন গাজা ‘গাজা’ শব্দে চোখে ভেসে ওঠে রক্ত ও ধ্বংসের ছবি। কিন্তু আজকের ‘গাজা’ সে আমাদের মন। স্ক্রিনে টিকটিক করে বেজে যায় সময়বোমা, ইনবক্সে নেমে আসে কটু বাক্যের গ্রেনেড, এক একটি রিল ভিডিও, এক একটি আঘাত আমাদের বিবেকের দেয়ালে। বইয়ের গন্ধ হারিয়ে গেছে, প্রশংসা আর ভালোবাসার খোঁজ চলছে লাইক আর কমেন্টে। এই তো সেই অদৃশ্য যুদ্ধে পরাজয়ের গল্প যেখানে প্রযুক্তি হাসে, আর হৃদয় কাঁদে। ইসলাম কী বলে? ইসলাম প্রযুক্তির বিরোধিতা করে না, বরং শিক্ষা দেয় ভারসাম্যপূর্ণ, আত্মসচেতন ব্যবহার। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর এক অমর বাণী, “কারও ইসলামের সৌন্দর্য এটাই- যা তার জন্য অপ্রয়োজনীয়, তা সে ত্যাগ করে।” (তিরমিজি)
তাহলে প্রশ্ন হলো আমার স্ক্রিন টাইম কি আত্মার আলো বাড়ায়, নাকি শুধু চোখ ধাঁধানো আলোয় ডুবে যায় মন?, মনকে ফিরিয়ে আনুন: কয়েকটি করণীয় ডিজিটাল ডায়েট প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে স্ক্রিন থেকে ছুটি দিন। ফজরের পর, খাওয়ার সময়: রাখুন “No Screen Hour”। মনের খোরাক দিন কুরআনের তিলাওয়াতে ডুব দিন। প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটান। ধ্যান, দোয়া, নিরবতায় খুঁজে নিন আত্মার আরাম। ডিজিটাল মুহাসাবা প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করুন: “আজ সময় দিলাম কাকে? স্ক্রিনকে, না স্রষ্টাকে?” হৃদয়ের কান্না: মানুষ কই?। মানুষ এখন “স্মার্টফোনে স্মার্ট” কিন্তু আত্মায় নিঃস্ব। ইমোজিতে হাসি, কিন্তু বাস্তবে বিষাদ। ফোন চার্জে, কিন্তু আত্মা পড়ে থাকে লো ব্যাটারিতে। আমরা হয়ে গেছি “মোবাইলমুখী মুনি” যারা গোটা দুনিয়াকে ঘুরে বেড়ায় স্ক্রিনে, কিন্তু নিজের মনকেই চিনতে পারে না। অন্তরের জাগরণ: এবার জেগে উঠি, এখন সময় প্রযুক্তির দাসত্ব থেকে মুক্তির। চলুন, মনকে ফিরিয়ে আনি জীবনের মূলমন্ত্রে যেখানে প্রযুক্তি হবে সহচর, আর হৃদয় হবে আলোকিত। জীবন হোক প্রাণবন্ত, মন হোক দীপ্ত, আত্মা হোক স্রষ্টার আলোয় পরিপূর্ণ।
মুফতি সাইফুল্লাহ আজহারী
গবেষক ও ইসলামি চিন্তাবিদ