মোড়কজাত খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও ক্ষতিকর চর্বির উপস্থিতি সহজে বোঝার জন্য কার্যকর ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে খাদ্যপণ্যের মোড়কের সামনের অংশে সহজ ভাষা, চিহ্ন বা সতর্কবার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয় কোনো পণ্যে চিনি, লবণ (সোডিয়াম), স্যাচুরেটেড ফ্যাট কিংবা ট্রান্স-ফ্যাটের মাত্রা অতিরিক্ত কি না। এর ফলে ভোক্তারা দ্রুত ও সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ হন।
আজ শনিবার (৯ মে) সকালে ঢাকার বাংলামোটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ও ভোক্তা অধিকার নিশ্চিতে ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং বিদ্যমান আইন ও নীতি শীর্ষক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেন্টার ফর ল’ অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স (সিএলপিএ), পাবলিক হেলথ ল’ ইয়ার্স নেটওয়ার্ক, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট, এবং সিটিজেন নেটওয়ার্ক- সিনেট এ আয়োজন করে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন সেন্টার ফর ল পলিসি এফের্য়াসের সেক্রেটারি এডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন। তিনি তার প্রবন্ধ উপস্থাপনার মাধ্যমে বলেন বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটে এসব রোগের কারণে এবং ৩০ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের মধ্যে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১৯ শতাংশ। এই বাস্তবতায় অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং একটি কার্যকর ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উদ্যোগ।
সভায় বক্তারা বলেন, শিশু ও তরুণদের লক্ষ্য করে অস্বাস্থ্যকর প্যাকেটজাত খাবারের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করা হলেও এসব পণ্যের পুষ্টিমান ও স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয় না। এর ফলে ভোক্তারা বিভ্রান্ত হন এবং অজান্তেই অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনিযুক্ত পানীয় গ্রহণ শিশুদের মধ্যে অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার (এডিএইচডি)-এর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
সভায় আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে চিনিযুক্ত পানীয় গ্রহণের হার দ্রুত বাড়ছে। ২০১৬ সালে যেখানে এই হার ছিল ১৩.২ শতাংশ, সেখানে ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬.৭ শতাংশে। পাশাপাশি, অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত পরিবারগুলোর স্বাস্থ্য ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি, যার বড় অংশই ব্যয় হয় ওষুধ ক্রয়ে।
বক্তারা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী জনগণের পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। সেই লক্ষ্যে নিরাপদ খাদ্য আইন ও সংশ্লিষ্ট প্রবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং চালু করা হলে ভোক্তারা খাদ্যের ঝুঁকি সহজে বুঝতে পারবেন, বিভ্রান্তিকর বিপণন কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। আলোচনা সভা থেকে দ্রুত কার্যকর, স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়, যাতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
সভায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিতি ছিলেন সাবেক উপদেষ্টা ও উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার। উক্ত আলোচনা সভায় নীতি বিশ্লেষক কামরুননিছা মুন্নার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন পাবলিক হেলথ ল ইয়ার্স নেটওর্য়াকের সদস্য-সচিব ব্যারিষ্টার নিশাত মাহমুদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাইফুর রহমান, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির সহযোগী অধ্যাপক মোঃ বজলুর রহমান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-র অ্যাডভোকেট সুলতান মুহাম্মদ বান্না, ব্যারিষ্টার বিভতি তরফদার, অ্যাডভোকেট মমতাজ পারভীন, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট মোঃ শাহাদত হোসেন, অ্যাডভোকেট মারুফ উল আবেদ, অ্যাডভোকেট শাহানেওয়াজ পাটয়ারী, অ্যাডভোকেট শাহদাত হোসাইন, অ্যাডভোকেট নিশাত তামন্না ঐথি, ব্রাক ইউনির্ভাসিটির সহযোগী অধ্যাপক মোঃ মোস্তফা খান, ডাস্ বাংলাদেশ নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের হেড অব প্রোগ্রাম সৈয়দা অনন্যা রহমান, টিসিআরসি প্রোগ্রাম কো-অডিনেটর ফারহানা জামান লিজা, সিএলপিএ এর পরামর্শক অধ্যাপক আ ফ ম সারোয়ার প্রমুখ। (সংবাদ বিজ্ঞপ্তি)