সংস্কৃতির স্বাভাবিক চলমান অগ্রসরতা মানুষের যাপিত জীবনের অগ্রসরতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। এবং এই প্রক্রিয়া বহতা নদীর মত। বহতা নদী যেমনি পাড় ভাঙ্গা গড়ার মধ্যে নিজের অস্তিত্বের জানান দেয় তেমনি মানুষের বিভাজিত শ্রম, উৎপাদন শিক্ষা (উৎপাদন সরঞ্জাম, শ্রম এবং উৎপাদনের উপায়), পারিপার্শ্বিক সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সংস্কৃতির আত্তীকরণ, বিবর্জন, বিবর্তন কালক্রমে পরিবর্তন ঘটায়।
আমাদের জনপদের বর্তমান সময়ের সংস্কৃতির সাথে ব্রিটিশ ভারতের সময়ের মানুষের সংস্কৃতির তুলনা করলে আমরা এর সত্যতা অনুধাবন করতে পারি। তবে কিছু কিছু সময় সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রভৃতি কারণে আমাদের উপর যেমনি একটা বৈরী বা ভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারা আরোপিত হয় তেমনি কখনো কখনো শাসক গোষ্ঠী শোষণের জন্য চাপিয়ে দেয় বিদ্বেষ মূলক সংস্কৃতি। এবং আমরা নিজেদের অজান্তেই (সাব কন্সিয়াস মাইন্ড) সেই আরোপিত সংস্কৃতি উৎপাদন ও লালন-পালন করি।
ব্রিটিশ রাজ দুইশত বছরে আমাদের মনোজগতে একটি মিথ উৎপাদন তথা সক্রিয় করেছিল যে, ইংরেজরা হচ্ছে রাজার জাতি। তাদের সংস্কৃত হচ্ছে উন্নত মানের। যার ফলে আমাদের হাজার বছরের স্থানিয় সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের ভূখন্ডের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধীরে ধীরে হীনমন্যতার তৈরি হয়। ফলশ্রুতিতে আমাদের পেশা, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক থেকে শুরু করে চিন্ত, চেতনা, শিক্ষা সবকিছুতেই আমাদের জাতির এক বিরাট পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আমরা ইংরেজিদের তথা আরোপিত সংস্কৃতি অনুকরণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হই। এর মধ্য দিয়ে সংস্কৃতিগত ভাবে ইংরেজদের নিকট আমাদের সাময়িক কিংবা চিরায়ত পরাজয় হয়। তারা ঔপানেবিশক শাসনকে স্থায়ীকরণ সফলকাম হয় এবং উপমহাদেশ ছেড়ে যাবার কালেও তারা বৈরী ও বিদ্বেষ মূলক ঘৃণ্য রাজনৈতিক কূট কৌশল ব্যাবহার করে যার বিদ্বেষ মূলক সাংস্কৃতিক ধারা সমগ্র জাতির মনোজগতে আজও বিরাজ করে ।
পাকিস্তান আমলেও আমরা দেখতে পাই পূর্ব বাংলার মানুষের মানসপটে গঙ্গা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নদীর মতো সিন্ধু, নর্মদা, কাবেরী, প্রভৃতি নদীকে নিজের মনে করত। কাবেরী নদীকে তার কাছে মনে হত বাড়ীর কাছের মধুমতি নদীর মতো।
জনগণের মধ্যে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে যেমন প্রতিবাদ ক্ষোভ কাজ করতে থাকে তেমনি করে সে আবার খাইবার গিরিপথের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের উপতক্যায় জীবনের সঙ্গে মিল খোজার চেষ্টা করে। তার কাছে বাদাম, আখরোট পশ্চিম পাকিস্তানি আঙগুরের সাথে দেশিয় ফলকে মিলানোর চেষ্টা করতে থাকে।
সংস্কৃতিকে শস্ত্র করা এই ভূখন্ডের মানুষের নিজস্বতা এবং জাতিসত্ত্বার গৌরবোজ্জল ঐতিহ্য। রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত, সত্যেন-রণেশসহ আমাদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জনেরা জনমানুষে প্রথিত করতে সফলকাম হন। ধারাবাহিকতায় ৭০ এর দশকে রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী শাসকদের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে পালিত হয়।....চলবে