বিকেলের শেষ রোদ নদীর জলে ঝিকমিক করছে। বাতাসে দুলছে কাশফুল, আকাশ ভেসে যাচ্ছে আজানের মায়াবী সুরে। নদীর ঘাটে বসে আছে এক কিশোরী নাম ফাতিমা। হাতে বই, চোখে শান্তি, হৃদয়ে আস্থা। মাথার ওড়না বাতাসে নেচে উঠছে, যেন সাদা মেঘের টুকরো। পাশেই খেলছে ছোট ছেলেমেয়েরা। হঠাৎ এক কিশোর কৌতূহলভরা দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করল “ফাতিমা, তুমি এত শান্ত কেন?” ফাতিমা হেসে বলল আমি স্বাধীন।
কিন্তু আমার স্বাধীনতা অন্যের চোখে নয়, আমার মর্যাদায়, আমার পর্দায়। এই ছোট্ট সংলাপেই লুকিয়ে আছে নারীর প্রকৃত মুক্তির দর্শন। স্বাধীনতা মানে দেহের বাজারজাতকরণ নয়, স্বাধীনতা মানে সম্মানের সুরক্ষা। বিকৃত স্বাধীনতার সংজ্ঞা আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত, আবার সবচেয়ে বেশি বিকৃত শব্দ “স্বাধীনতা”। বিশেষত নারী স্বাধীনতার নামে পশ্চিমা দর্শন দাঁড় করিয়েছে এক ভোগবাদী সংস্কৃতি, যেখানে স্বাধীনতার মানদণ্ড কেবল শরীর উন্মুক্ত করা। তারা বলে “যেমন খুশি পোশাক পরো, সেটাই স্বাধীনতা”। কিন্তু প্রশ্ন হলো স্বাধীনতা কি শরীরকে বাজারে তোলা, নাকি ইজ্জত ও মর্যাদাকে রক্ষা করা?, নাস্তিকদের আপত্তি, ইসলামের জবাব তাদের অভিযোগ তিনটি: ১. পর্দা নারীকে বন্দি করে। ২. পর্দা নারীকে ঘরে আটকে রাখে। ৩. পর্দা নারী পুরুষের সমান স্বাধীনতায় বাধা দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলোর সভ্যতার প্রতিটি স্তরেই শৃঙ্খলা অপরিহার্য। রাস্তায় চলার জন্য ট্রাফিক আইন আছে। সেনাদের নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম আছে। ডাক্তারদের ড্রেস কোড আছে। তাহলে শুধু নারীর দেহ উন্মুক্ত রাখাই কেন স্বাধীনতা? আসলে, পর্দা শৃঙ্খলার আরেক নাম, আর শৃঙ্খলা ছাড়া কোনো স্বাধীনতা স্থায়ী হয় না। কুরআন ও হাদিসের ঘোষণা আল্লাহ বলেন: “হে নবী! মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন দৃষ্টি সংযত করে, লজ্জাস্থান রক্ষা করে, এবং নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে তবে যা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায় তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের ওড়না বক্ষদেশের উপর টেনে দেয়” (সূরা আন–নূর: ৩১)।
রাসূল (সা.) বলেছেন: “নারী হলো আবরাহ (লজ্জাশীলতার প্রতীক)। যখন সে বের হয়, শয়তান তার দিকে দৃষ্টি দেয়” (তিরমিজি)। অতএব, পর্দা কোনো শৃঙ্খল নয়; বরং সম্মান, নিরাপত্তা ও লজ্জাশীলতার রক্ষাকবচ।
গল্পের আঙ্গিকে সত্য- একদিন হযরত আয়েশা (রা.) এর পাঠশালায় এক ছাত্র প্রশ্ন করল: উন্মুক্তভাবে চললে কি আমরা শক্তিশালী হব? তিনি উত্তর দিলেন: “শক্তি আসে লাজ ও মর্যাদায়, উলঙ্গতায় নয়। পর্দার ভেতর থেকেও আলো ছড়ানো যায় যেমন সূর্য মেঘের আড়াল থেকেও দিগন্ত আলোকিত করে।”
বিজ্ঞানের আলোতে পর্দার অপরিহার্যতা- মনোবিজ্ঞান: উন্মুক্ত পোশাক দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যৌন কল্পনা ও অপরাধকে উসকে দেয়। পর্দা সেই প্রাথমিক ধাপেই বিপদ রোধ করে। সমাজবিজ্ঞান: যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি তিন মিনিটে একটি ধর্ষণ হয়। প্রতি ছয়জন নারীর একজন যৌন হয়রানির শিকার। অথচ মুসলিম সমাজে, যেখানে পর্দা প্রচলিত, হারটি বহুগুণ কম। নিউরোসায়েন্স: অশ্লীল দৃশ্য মস্তিষ্কে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, ফলে- পর্ন আসক্তি, মানসিক চাপ, পারিবারিক ভাঙন। পর্দা এ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
উলঙ্গতার ফলাফল: ৫০% এর বেশি বিবাহবিচ্ছেদ। সিঙ্গেল মাদারের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি। যৌন রোগ ও এইডসের প্রকোপ। নারীর আত্মহত্যা ও মানসিক রোগের বহুগুণ বৃদ্ধি। উলঙ্গতা স্বাধীনতা নয় বরং বাজারের দাসত্ব ও পুরুষতান্ত্রিক ভোগবাদিতার শিকল।
ইতিহাস সাক্ষী: পর্দার ভেতর থেকেও আলো হযরত আয়েশা (রা.) শ্রেষ্ঠ মহিলা আলেমা, হাজারো সাহাবির শিক্ষাগুরু। রুবাইদা: আব্বাসীয় মহীয়সী নারী, যিনি হাজীদের পথ সহজ করতে অর্থ দান করেছিলেন। ফাতিমা আল ফিহরি: বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। নুসাইবা বিনতে কাব (রা.) যুদ্ধে রাসূল( সা.)কে রক্ষা করেছিলেন। এরা প্রমাণ করেছেন পর্দার ভেতর থেকেও নারী হতে পারে সভ্যতার নির্মাতা।
প্রতীকী দৃষ্টান্ত: ফুল যেমন সূর্যের দিকে মাথা তোলে, তেমনি পর্দা নারীকে আকাশের উচ্চতায় তুলে ধরে। পর্দা যেন রাজকীয় মুকুট যা নারীকে সম্ভ্রম ও নিরাপত্তার সিংহাসনে বসায়। নগ্নতা হলো মরীচিকা, পর্দা হলো ঝর্ণার স্বচ্ছ জলের মতো প্রশান্তি।
শেষকথা : নারীর প্রকৃত মুকুট, পর্দা নারীর অলংকার ও মর্যাদা। পর্দা মানসিক শারীরিক স্বাস্থ্য রক্ষা করে। পর্দা সমাজে নিরাপত্তা ও শান্তি আনে। পর্দা নারীকে আলোকবর্তিকা করে তোলে। নগ্নতা নারীকে শোষণের কবলে ফেলে, কিন্তু পর্দা তাকে আসমানি মর্যাদায় উন্নীত করে। সত্য একটাই পর্দা নারীর বন্দিত্ব নয়, তার গৌরবময় আলোকধারা। পর্দাই নারীর প্রকৃত স্বাধীনতার বৈজ্ঞানিক ঘোষণা, আর সেটাই তার রাজকীয় মুকুট।