ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার ও সরকারি তদারকি কর্মকর্তার আড়ালে নিজেই ঠিকাদার সেজে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপ-সহকারী প্রকৌশলী কাজী মহসীন উদ্দিনের বিরুদ্ধে। সরকারি বিধিবিধান, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গড়ে তুলেছে একচ্ছত্র ক্ষমতার আধিপত্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডে যোগদানের পর আর বদলি হতে হয়নি তাকে। নিয়ম ভেঙ্গে তৎকালীন স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে গভীর সখ্যতা গড়ে চার বছর ধরে বহাল তবিয়তে আছেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাকে প্রকাশ্যে নানা কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতেও দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজের ক্ষমতার প্রভাব ধরে রাখতে ও অবৈধ জমি দখলের পর বিনামূল্যে ভবনের আর্কিটেকচারাল নকশা তৈরি করে দেওয়ার বিনিময়েই তিনি একটি রাজনৈতিক দলের বা নেতাকর্মীদের আশ্রয় হাসিল করেন।
আচরণবিধি ভেঙ্গে শহরের সমবায় মার্কেটে ‘রূপসী বাংলা’ নামে পরিচালনা করছেন ব্যক্তিগত আর্কিটেকচারাল কনসাল্টেন্সি ফার্ম। নথিপত্রে স্ত্রী মালিক হলেও তিনি নিজেই এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। দাপ্তরিক কাজের অজুহাতে অফিস ফাঁকি দিয়ে সেখানেই সময় দিচ্ছেন এবং বিক্রি করছেন বাণিজ্যিক নকশা। এমনকি ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা হয়ে প্রশাসনিক অনুমতি না থাকলেও নিজ কক্ষে সার্বক্ষণিক এসি চালিয়ে দাপ্তরিক বিলাসিতায় করেন অফিস।
তবে সবচেয়ে বড় জালিয়াতির প্রমাণ মিলছে টেন্ডার প্রক্রিয়ায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব বাজেটের অধীনে ভাটই শাখায় ‘এস-৬এ’ জি-কে সেচ খালের সংস্কারের জন্য পৃথক দুটি ই-জিপি দরপত্র আহ্বান করা হলেও, দুই প্রকল্পেই আড়ালে থেকে তিনি নিজেই ঠিকাদারি করেছেন।
সুনির্দিষ্ট নথি ও রেকর্ড অনুযায়ী, ভাটই এলাকায় এস-৬এ সেচ খালের শুরু থেকে দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত উভয় বাঁধ মেরামত ও সংরক্ষণ কাজের প্রথম প্রকল্পটিতে ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি দরপত্র প্রকাশিত হয়। কাগজপত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে 'চুক্তি স্বাক্ষরিত' দেখালেও বাস্তবে তদারকি কর্মকর্তা কাজী মহসীন উদ্দিন নিজেই কাজটির সার্বিক বাস্তবায়ন ও আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করেন।
একইভাবে ওই খালেরই ৩ কিলোমিটার থেকে সাড়ে ৪ কিলোমিটার (৩ থেকে ৪.৫ কিমি) পর্যন্ত পাড় সংস্কারের দ্বিতীয় প্রকল্পে রংপুরের ঠিকাদার মোঃ হাসিবুল হাসানের নামে ২১ লাখ ৪৮ হাজার ৬২৬ টাকার চুক্তি দেখানো হলেও বাস্তবে মূল ঠিকাদার ছিলেন কাজী মহসীন উদ্দিন নিজেই। তদারকির দায়িত্বে থেকে নিজে ঠিকাদার সেজে নিম্নমানের কাজ সম্পাদন করে সরকারি অর্থ লুটপাটেরও অভিযোগ উঠেছে।
শুধু টেন্ডারবাজিই নয়, চরমুরারিদহ এলাকার D7N নিষ্কাশন খাল থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনে সরাসরি মদদ দিয়ে মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যার ফলে অনিয়ন্ত্রিত বালি তোলায় খালের পাড় ধসে রাস্তাঘাটসহ অন্তত ১০-১২টি বসতবাড়ি ঝুকির মুখে রয়েছে। আর এই কৃত্রিম ধস মেরামতের নামে সরকারকে পুনরায় বিপুল টাকা অতিরিক্ত বাজেট দিতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী কাজী মহসীন উদ্দিন সব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, "কনসাল্টেন্সি ফার্মের মালিক আমার স্ত্রী, আমি অবসর সময়ে কেবল সেখানে গিয়ে বসি। আর টেন্ডার বা বালু উত্তোলনের যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।"
এদিকে সরকারি চাকরিজীবী হয়ে বাণিজ্যিক ফার্ম পরিচালনা ও টেন্ডার অনিয়মের প্রশ্নে ক্যামেরা এড়িয়ে মুঠোফোনে অসংলগ্ন বক্তব্য দেন ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস। তিনি বলেন, "চাকরির বিধিমালা দেখতে হবে। আপনারা তথ্য অধিকারে আবেদন করেন, নীতিমালা দেখে জানাবো।"
ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভাবমূর্তি রক্ষা ও সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধে এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি স্থানীয় সচেতন মহলের।